কোম্পানির আমলে বিভিন্ন বিদ্রোহ || Various Revolts During The Company's Rule


• 1763 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1856 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমগ্র ভারত জুড়ে প্রায় চল্লিশটি বড় এবং অসংখ্য ছোট বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল।
• 1776 খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে রাজা শের দৌলত, রামু খাঁ, জানবক্স খাঁ অতিরিক্ত ভূমি রাজস্বের বিরুদ্ধে চাকমা বিদ্রোহ করেছিলেন।
• 1769 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গোপসাগরের কিছু দ্বীপ নিয়ে গঠিত নোয়াখালীর সন্দীপ অঞ্চলে মুসলিম কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে জমিদার আবু তোরাপ চৌধুরী কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে সন্দীপ বিদ্রোহ করেছিলেন।
• 1817 খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি বিদ্যাধর মহাপাত্রের নেতৃত্বে ওড়িশায় পাইক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যা খেরদা বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
• 1824 খ্রিস্টাব্দে ফকির করম শাহের পুত্র টিপুর নেতৃত্বে পাগলপন্থী বিদ্রোহ শুরু হয়।
• 1800 খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুরের লবন উৎপাদক মালঙ্গিরা কোম্পানির বিরুদ্ধে বলাই কুন্ডু ও প্রেমানন্দ সরকারের নেতৃত্বে মালঙ্গি বিদ্রোহ করেছিল।
• 1846 খ্রিস্টাব্দে নরসিংহ রেড্ডির নেতৃত্বে তামিলনাড়ুর কারনুলে পলিগার বিদ্রোহ শুরু হয়।
• 1805 খ্রিস্টাব্দে ত্রিবাঙ্কুরে ভেলু থাম্পি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ : উত্তরবঙ্গের মাদারি সম্প্রদায়ের ফকির এবং পূর্ববঙ্গ ও ময়মনসিংহের গিরি, গোসাই ও নাগা সন্ন্যাসীরা 1763 খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই বিদ্রোহ শুরু করে। পরে ক্ষমতাচ্যুত জমিদার, ছাঁটাই হওয়া সৈনিক ও বিতাড়িত কৃষক এই বিদ্রোহে যোগ দেয়। প্রায় 50 হাজার মানুষ এই বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের উল্লেখ আছে। ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, কৃপানাথ, মুসা শাহ, মজনু শাহ, পরাগল শাহ, চিরাগ আলী শাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব ছিলেন। প্রায় চার দশক ধরে চলা এই বিদ্রোহ 1800 খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়।

মোপলা বিদ্রোহ : ব্রিটিশ শাসকরা কেরালার মালাবার অঞ্চলের উঁচু জাতের হিন্দু নাম্বুদ্রি ও নায়ার জেনমি বা জমিদারদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে উদ্যোগি হলে অসংখ্য মুসলিম ইজারাদার বা কনমদার ও কৃষক বা বেরুসপট্টমদার যারা মোপলা নামে পরিচিত তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। 1836 খ্রিস্টাব্দে মোপলারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং 1919 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট 28 টি অভ্যুত্থান ঘটে। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন সৈয়দ আলাবি ও তার পুত্র সৈয়দ ফদল।

রামোসি বিদ্রোহ : 1826 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে ব্রিটিশের উচ্চ রাজস্বের বিরুদ্ধে রামোসি উপজাতির বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রোহের নেতা হলেন উমাজি নায়েক, ত্রিম্বকজি সাওয়ান্ত ও দাদাজি দৌলত রাও। 1829 খ্রিস্টাব্দে রামোসি বিদ্রোহের নেতাদের ফাঁসি হয়।

ভিল বিদ্রোহ : 1828 খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চলের ভিল উপজাতি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেছিল। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন চিল নায়েক, হিরিয়া এবং শিউরাম। 1846 খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে।

কোলি বিদ্রোহ : মহারাষ্ট্রে পশ্চিমঘাট পর্বত ও কউচ এর মধ্যবর্তী অঞ্চলের দুর্ধর্ষ কোলি উপজাতি ব্রিটিশের শোষণ নীতির বিরুদ্ধে 1824 খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিদ্রোহ করে। 1828 খ্রিস্টাব্দে সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন রামজি ভাংরিয়া। পরে রঘুজি ভাংরিয়া বিদ্রোহ চালিয়ে যান এবং বহু প্যাটেল বা গ্রাম্য মোড়ল কে হত্যা করেন। 1850 খ্রিস্টাব্দে সরকার রঘুজিকে গ্রেফতার করলে কোলি বিদ্রোহ পুরোপুরি অবদমিত হয়।

চুয়াড় বিদ্রোহ : 1768 খ্রিস্টাব্দে ধলভূমির রাজা জগন্নাথ সিং চুয়ার কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। ক্যাপটেন মর্গান তা ব্যর্থ করে দেন। কোম্পানির শাসন কালে বাংলার প্রথম আদিবাসী বিদ্রোহ ছিল চুয়াড় বিদ্রোহ। আসল বিদ্রোহ টি শুরু হয় 1798 খ্রিস্টাব্দে চুয়ার নেতা দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে নিষ্কর জমি বেদখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।

রংপুর বিদ্রোহ : 1783 খ্রিস্টাব্দে রংপুরের শকিনা, ফতেপুর, কাজিরহাট ও ডিমলা অঞ্চলের কৃষকরা সমবেত হয়ে নুরুলউদ্দিনের নেতৃত্বে  ইজারাদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তেপা গ্রামে একটি স্বাধীন স্থানীয় সরকার গঠন করে। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ এই সরকার চলেছিল।

কোল বিদ্রোহ : 1820-21 খ্রিস্টাব্দে পোড়াহাটের জমিদার ও তার ইংরেজ সেনাপতি রোগসেস-এর বিরুদ্ধে কোলরা বিদ্রোহ (চাইবাসার যুদ্ধ) শুরু করে। কোলরা এই যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। কিছুদিন পর 1831-1832 খ্রিষ্টাব্দে আবার কোল বিদ্রোহ শুরু হয়। বুদ্ধু ভগত, জোয়া ভগত, বিন্দ্রাই মাংকি ও সুই মুন্ডা বিদ্রোহের নেতা ছিলেন। মানভূম, সিংভূম, রাঁচি, হাজারীবাগ, পালামৌ, ছোটনাগপুর প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

সাঁওতাল বিদ্রোহ : 1855 খ্রিস্টাব্দে 7 ই জুলাই বিহারের রাজমহল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শান্তি প্রিয় অরণ্যচারী সাঁওতালরা সিধু ও কানুর নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। রাচি হাজারীবাগ বীরভূম ছোটনাগপুর মেদিনীপুর পুরুলিয়া ও ভাগলপুরে এ বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সাঁওতাল বিদ্রোহ বা হুলের প্রতীক ছিল ‘শাল গাছ'।

ফরাজি আন্দোলন : ‘ফরাজি' শব্দের অর্থ ‘ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য'। 1818 খ্রিস্টাব্দে হাজি শরীয়তুল্লাহ ভারতে ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তন করেন। এই আন্দোলন 1906 খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল প্রভৃতি  স্থানের গরিব হিন্দু-মুসলিম কৃষক, তাঁতি, কারিগর, শ্রমিক প্রমূখ নীলকর সাহেব ও হিন্দু-মুসলিম জমিদারদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। 1820 খ্রিস্টাব্দে শরীয়তুল্লাহ ফরাজী নামে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় গঠন করেন। 1837 খৃষ্টাব্দে শরীয়তউল্লাহ মারা গেলে তার পুত্র দুদুমিঞা এই আন্দোলনের হাল ধরেন।

ওয়াহাবি আন্দোলন : ‘ওয়াহাবি’ কথার অর্থ হলো ‘নবজাগরণ’। ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার ও দুর্নীতি মুক্ত করতে আরব দেশে  আব্দুল ওয়াহাব নামে এক ধর্মপ্রাণ মনীষী প্রথম আন্দোলন করেন। তার নামানুসারে এটি ওয়াহাবি আন্দোলন নামে পরিচিত। ভারতে এই আন্দোলন শুরু করেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও তারপুত্র আজিজ। শাহ ওয়ালিউল্লাহ এই আন্দোলনের সুচনা করলেও ভারতে এ আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলির অধিবাসী সৈয়দ আহমদ। 1820 খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণের কথা প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে সিওলোয়  তার সদর কার্যালয় গড়ে তোলেন। পাঞ্জাবের শাসক ও জমিদাররা মুসলিম প্রজাদের উপর নির্যাতন করলে তিনি 1831 খ্রিষ্টাব্দে জিহাদ ঘোষণা করে বালাকোর্টের যুদ্ধে শিখদের হাতে পরাজিত ও নিহত হন।

বারাসাত বিদ্রোহ : 1831 খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন মীর নিসার আলী বা তিতুমীর। তার ভাগ্নে সেনাপতি গোলাম মাসুম ও সহকর্মী মইনুদ্দিন তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন। তিতুমীরের বাহিনীতে বহু নিম্নবর্ণের হিন্দু যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বাদুড়িয়া থানার 10 কিলোমিটার দূরে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করে ব্রিটিশ শাসন কে উপেক্ষা করে খাজনা আদায় শুরু করেন। 1831 খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিঙ্ক এর নির্দেশে কামানের গোলায় বাঁশেরকেল্লা ধূলিসাৎ হয়। তিতুমীর এবং তার অধিকাংশ সেনা মারা যায়।

নীল বিদ্রোহ : ইংরেজ বণিক কার্ল ব্ল্যাক ভারতে সর্বপ্রথম নীল শিল্প গড়ে তোলেন। ফরাসি বণিক লুই বোনার্ড ছিলেন ভারতের প্রথম নীলকর (1777 খ্রিস্টাব্দ)। 1822 খ্রিস্টাব্দে ‘সমাচার চন্দ্রিকা' ও ‘সমাচার দর্পণ' পত্রিকায় প্রথম নীলকরদের অত্যাচারের কথা প্রকাশিত হয়। 1849 খ্রিস্টাব্দে অক্ষয় কুমার দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেন। 1860 খ্রিস্টাব্দে দীনবন্ধু মিত্রের বিখ্যাত নীলদর্পণ নাটক প্রকাশিত হয়। ভারত প্রেমিক রেভারেন্ড জেমস লং এর উদ্যোগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন। 1859 খ্রিস্টাব্দের কৃষ্ণনগরের কাছে চৌগাছা গ্রামে বিষ্ণুচরন বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে নীল চাষীদের সঙ্গবদ্ধ করে বিদ্রোহ শুরু করে। ক্রমেই বিদ্রোহ সমগ্র নদীয়া, যশোহর, পাবনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, খুলনা, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, বারাসাত - বাংলা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। 1860 খ্রিস্টাব্দে নীল কমিশন গঠিত হয়। 1868 খ্রিস্টাব্দের ‘অষ্টম আইন' দ্বারা ‘নীলচুক্তি আইন' রদ করে বলা হয় নীল চাষ সম্পূর্ণ ভাবে চাষীদের ইচ্ছাধীন। 1892 খ্রিস্টাব্দে রাসায়নিক পদ্ধতিতে নীল উৎপাদনের ফলে এদেশে নীল চাষ উঠে যায়।

দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ : 1874 খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে পুনা জেলার কারদে গ্রামে এই বিদ্রোহের সূচনা হয়। কারদে গ্রামের কালুরাম নামে জনৈক মারোয়ারী মহাজন অন্যায় ভাবে ঋণের দায়ে বাবাসাহেব দেশমুখ নামে এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির জমি ও ঘরবাড়ি আদালতের আদেশে আত্মসাৎ করে। তিনি গ্রামের সকল কৃষককে একত্রিত করে এই ঘটনার প্রতিশোধ গ্রহণের অনুরোধ করেন। গ্রামের দরিদ্র কৃষকেরা মহাজনকে সামাজিক বয়কট করে। আতঙ্কিত মারোয়ারি মহাজনরা পুলিশের সাহায্য নিয়ে গ্রাম ত্যাগের চেষ্টা করলে গ্রামবাসীরা তাদের বাধা দেয়। 1875 খ্রিস্টাব্দে 12 ই মে পুনা জেলার সুপা গ্রামে উন্মত্ত জনতা গুজরাটি মহাজনদের ঘরবাড়ি, দোকান, গদি ও গুদাম লুন্ঠন করে এবং তাতে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর এই আন্দোলন আহম্মদনগর, ইন্দাপুর ও পুরন্দর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিব্যাপ্ত হয়। বিদ্রোহের কারণ অনুসন্ধানের জন্য সরকার 1876 খ্রিস্টাব্দে ‘দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ কমিশন' বা ‘Deccan riot Commission' নিয়োগ করে। এই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে 1879 খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্য কৃষি সাহায্য আইন (Deccan agriculturists Relief Act) প্রবর্তিত হয়।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.