1857 সালের মহাবিদ্রোহ || The Revolt of 1857


• লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি ও কুশাসনের অজুহাতে সাতারা, সম্বলপুর, নাগপুর, ঝাঁসি, তাঞ্জোর, কনাটক, অযোধ্যা প্রভৃতি রাজ্যগুলি গ্রাস করেন। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও এর দত্তকপুত্র নানা সাহেব এর বাৎসরিক ভাতা ও পেশোয়া পদ বিলুপ্ত করেন। দিল্লির বাদশাহকে রাজপ্রাসাদ থেকে বহিস্কৃত করেন এবং তার উপাধি বিলুপ্ত করেন। নির্লজ্জভাবে অযোধ্যা ও নাগপুরে রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠন করেন।
• 1757 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1857 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই 100 বছরে কোম্পানি এদেশ থেকে প্রচুর সোনা রুপা ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়। তাদের একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার শুল্ক রহিত ইংল্যান্ডের পন্য সামগ্রীর কাছে ভারতীয় কুটির শিল্পজাত সামগ্রী টিকতে পারেনি। এরফলে ভারতীয় কুটির শিল্প ধ্বংস হয় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। ভারত পরিণত হয় ম্যানচেস্টার ও ল্যাঙ্কাশায়ারের কাঁচামাল সরবরাহের উৎস ও উৎপন্ন পণ্যের বাজারে।
• ব্রিটিশদের রেস্তোরাঁ, পার্ক, হোটেল, ক্লাব প্রভৃতি স্থানে ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। বহু ইউরোপীয় নাইট ক্লাবের প্রবেশ পথে লেখা থাকতো – “কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ”।
• ইউরোপীয় সেনাদের চেয়ে ভারতীয় সেনাদের বেতন কম ছিল, তাদের খাওয়া-দাওয়া ছিল নিম্নমানের, ভারতীয়দের সহজে পদোন্নতি হত না, তাছাড়া ইংরেজ ব্যাটেলিয়ান তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতো। সিন্ধু বা পাঞ্জাবের ভারতীয় সেনাদের দূর দেশে যুদ্ধের জন্য যে ‘বাট্টা’ বা বাড়তি ভাতা দেওয়া হতো তা বন্ধ হলে অসন্তোস বাড়ে। তৎকালীন ভারতীয় সমাজে সমুদ্রযাত্রা জাতিচ্যুত হওয়ার শামিল ছিল। তা সত্বেও ভারতীয় সৈন্যদের সমুদ্র অতিক্রম করে ব্রক্ষ্মদেশে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
• জেলখানায় ভারতীয় কয়েদিদের  যাজকরা মুক্তির লোভ দেখিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতেন। দারিদ্রতার সুযোগে ভারতীয়দের নানা সুবিধা দেয়ার অজুহাতে খ্রিস্টান করা হয়। এই অভিসন্ধি মূলক উদ্দেশ্যের জন্য মানুষ সিপাহী বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে।
• বিদ্রোহের ক্ষেত্র পূর্ব থেকে প্রস্তুত ছিল‌। এনফিল্ড রাইফেল নামে এক নতুন বন্দুক সিপাহিদের হাতে দেওয়া হয়, যার কার্তুজ আবরণী গরু ও শুকরের চর্বি দিয়ে নাকি তৈরি। এটি দাঁত দিয়ে ছিড়ে বন্ধুকে পুড়তে হতো। গুজব ছড়ায় হিন্দু মুসলমান সিপাহিদের ধর্ম নাসের চেষ্টা হচ্ছে। 1857 খ্রিস্টাব্দের 26 শে ফেব্রুয়ারি মুর্শিদাবাদের বহরমপুর সেনানিবাসে চর্বি মাখানো টোটানিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর 29 শে মার্চ ব্যারাকপুরের সেনানিবাসে মঙ্গল পান্ডে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় মঙ্গল পান্ডের ফাঁসি হয়। তিনি ভারতের প্রথম শহীদ। 1857 খ্রিস্টাব্দের 10ই মে মিরাট সেনানিবাসে প্রকৃতপক্ষে বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহ ক্রমে দিল্লি, অযোধ্যা, কানপুর, লখনৌ, বেরিলি, ঝাঁসি, বিহার প্রভৃতি ভারতের এক বিরাট অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
• বিদ্রোহী সিপাহীরা দিল্লির গদিচ্যুত বাদশাহ দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ কে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও তিনি নামসর্বস্ব নেতা ছিলেন। দিল্লিতে এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর সুবেদার বখত খান। কানপুরে বিদ্রোহের নেতা ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও এর পোষ্যপুত্র নানাসাহেব। তার পক্ষে সেনাপতি তাতিয়া টোপি ও মন্ত্রী হাকিম আজিমুল্লা বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। অযোধ্যার বেগম হজরৎমহল তার নাবালক পুত্র বরজিস কাদির কে সিংহাসনে বসিয়ে নিজে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। ঝাঁসি তে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন রানী লক্ষ্মীবাঈ। বিহারে মুখ্য সংগঠক ছিলেন  কুনওয়ার সিং। ফৈজাবাদে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন মৌলবি আহম্মদুল্লা। আসামে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন মনিরাম দেওয়ান। বেরিলি-র নেতা ছিলেন খাঁ বাহাদুর খাঁ।
• গোয়ালিয়র এর সিন্ধিয়া, ইন্দোরের হোলকার, হায়দ্রাবাদের নিজাম, যোধপুরের রাজা, ভূপালের নবাব, পাটিয়ালা, সিন্ধু ও কাশ্মীরের শাসক এবং নেপালের রানা প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজদের সমর্থন করেছিলেন।
• 1858 খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের মধ্যে সমগ্র ভারতে বিদ্রোহ দমিত হয়।
• বিদ্রোহ সমাপ্ত হলে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ কে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয় এবং 1862 খ্রিস্টাব্দে তিনি সেখানে মৃত্যু বরণ করেন। নানা সাহেব এবং বেগম হযরত মহল নেপালে পালিয়ে যান। যুদ্ধক্ষেত্রে রানী লক্ষ্মীবাঈ এর মৃত্যু ঘটে। তাতিয়া টোপি বন্দী হন এবং 1859 সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

1858 খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন : 1858 খ্রিস্টাব্দের 2 রা আগষ্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারত শাসন (Government of India Act, 1858) পাস করে। এই আইনের মাধ্যমে ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার মহারানী ভিক্টোরিয়ার হস্তে অর্পীত হয়। রানীর প্রতিনিধি হিসেবে গভর্নর জেনারেল ভারতের শাসনভার পরিচালনা করেন। তিনি ভাইসরয় উপাধিতে ভূষিত হন। ভারতের প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন লর্ড ক্যানিং।

মহারানীর ঘোষণাপত্র : 1858 সালে 1 লা নভেম্বর এলাহাবাদে এক দরবারে লর্ড ক্যানিং একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, এটিই মহারানীর ঘোষণাপত্র নামে পরিচিত।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.