মুঘল পরবর্তী সময়ে কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ - মারাঠা শক্তি || Regional Uprising In The Later Mughal Period - Maratha Administration


শিবাজী : 1627 খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে 1630 খ্রিস্টাব্দে) শিবন এর গিরি দুর্গে শিবাজীর জন্ম হয়। তার পিতা শাহজি ভোঁসলে আহম্মদনগরের সুলতানের অধীনে পুনার জায়গীরদার ছিলেন। পরে তিনি বিজাপুরের সুলতান এর অধীনে চাকরি গ্রহণ করে কর্নাটকে জায়গীর পান এবং তার দ্বিতীয় পত্নি তুকাবাঈয়ের সঙ্গে সেখানেই বসবাস করতেন। শিশু শিবাজী ও তার মাতা জিজাবাঈ, দাদাজি কোণ্ডদেব নামে জনৈক বিচক্ষণ ব্রাহ্মণের অভিভাবকত্বাধীনে পুনায় বসবাস করতে থাকেন। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অধিবাসী মাওলি দের নিয়ে তিনি এক সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী গঠন করেন। 1647 খ্রিস্টাব্দে দাদাজি কোণ্ডদেবের মৃত্যুর পর শিবাজি বিজাপুরের অন্তর্গত তোরণা দুর্গটি অধিকার করেন। শিবাজী কে দমনের জন্য বিজাপুরের সুলতান আলী আদিল শাহ, আফজাল খাঁর নেতৃত্বে এক বিরাট সেনাবাহিনী পাঠান। আফজাল খাঁ শিবাজীর হাতে নিহত হন এবং তিনি দক্ষিণ কঙ্কন ও কোলাপুর জয় করে নেন। 1663 খ্রিস্টাব্দে শিবাজী ঔরঙ্গজেবের মাতুল ও দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা শায়েস্তা খাঁর শিবিরে অতর্কিতে হানা দিয়ে তার পুত্র সহ 40 জন অনুগামী কে হত্যা করেন। তার তরবারির আঘাতে শায়েস্তা খাঁ একটি আঙুল হারিয়ে কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে দাক্ষিণাত্য ত্যাগ করেন। এরপর ঔরঙ্গজেব শিবাজী কে দমন করার জন্য অম্বর-এর রাজা জয় সিংহ ও দিলীর খাঁ কে পাঠান। 1665 খ্রিস্টাব্দে তারা শিবাজী কে এক সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। এই সন্ধি ‘পুরন্দরের সন্ধি' নামে পরিচিত। এই সন্ধির শর্ত অনুযায়ী শিবাজী তার পঁয়ত্রিশটি দুর্গের মধ্যে তেইশটি মোগলদের ছেড়ে দেন। 1666 খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের আমন্ত্রণে ও জয়সিংহের অনুরোধে শিবাজী শিশুপুত্র শম্ভুজি-সহ আগ্রায় যান। দরবারে তাকে উপযুক্ত সম্মান না দেওয়ায় তিনি প্রতিবাদ করলে ঔরঙ্গজেব তাকে আগ্রা দুর্গে নজর বন্দি করে রাখেন। শিবাজী শিশুপুত্র-সহ কৌশলে সেখান থেকে পলায়ন করে নিজের রাজ্যে ফিরে আসেন। কোনোভাবেই পরাজিত করা সম্ভব নয় দেখে ঔরঙ্গজেব তাকে রাজা বলে স্বীকার করেন এবং জায়গীর হিসাবে বেরার দান করেন। 1670 খ্রিস্টাব্দে শিবাজী মোগলদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করেন। যে তেইশটি দুর্গ তিনি মোগলদের ছেড়ে দিয়েছিলেন সেগুলি একে একে পুনরুদ্ধার করেন। 1674 খ্রিস্টাব্দে ‘ছত্রপতি’ ও ‘গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক' উপাধি ধারণ করে রায়গর দুর্গে অভিষেক সম্পন্ন করেন। 1680 খ্রিস্টাব্দে 53 বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। শিবাজী কে পরামর্শ দেবার জন্য অষ্টপ্রধান বা 8 জন মন্ত্রী নিয়ে গঠিত একটি পরিষদ ছিল । শিবাজীর মারাঠা রাজ্য দু'ধরনের অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল স্বরাজ্য (প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চল) ও মূলকাগিরি (যেসব অঞ্চল তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়মিত কর দিত)। শিবাজী পার্শ্ববর্তী বিজাপুর ও মুঘল অধিকৃত অঞ্চল থেকে চৌথ (ফসলের এক-চতুর্থাংশ) এবং সরদেশমুখী (ফসলের এক-দশমাংশ) নামে দুই প্রকারের কর আদায় করতেন। শিবাজীর অশ্বারোহী বাহিনী বারগির ও শিলাদার নামে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বারগিরদের সরকার থেকে অস্ত্র, পোশাক ও অশ্ব দেওয়া হত। শিলাদাররা নিজ দায়িত্বে সাজসরঞ্জাম ও অস্ত্রাদি সংগ্রহ করত।

শিবাজীর পরবর্তী মারাঠা সাম্রাজ্য : 1680 খ্রিস্টাব্দে শিবাজীর মৃত্যুর পর তার পুত্র শম্ভুজী মারাঠা সিংহাসনে বসেন। তিনি মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন এবং তার পুত্র শাহুকে (দ্বিতীয় শিবাজী) বন্দি করা হয়। 1689 খ্রিস্টাব্দে শম্ভুজির পর তার ভাই রাজারাম এবং রাজারাম এরপর তার বিধবা স্ত্রী তারাবাঈ শিশুপুত্র তৃতীয় শিবাজী কে সিংহাসনে বসিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। 1707 খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাহাদুর শাহ, শাহু কে মুক্তি দেন। শাহু ও তৃতীয় শিবাজী যথাক্রমে সাতারা ও কোলাপুরে নিজ নিজ রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। অবশেষে বালাজি বিশ্বনাথ নামে জনৈক কূটনীতিজ্ঞ ব্রাহ্মণের সহায়তায় শাহু তার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে মারাঠা সিংহাসন দখল করেন। 1713 খ্রিস্টাব্দে বালাজি বিশ্বনাথ তার ‘পেশোয়া’ বা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই সময় থেকে ‘পেশোয়া'ই প্রকৃতপক্ষে মারাঠা রাজ্যের প্রধান শাসকে পরিণত হন এবং পেশোয়া পদ বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। শাহুর রাজধানী ছিল সাতারা, অপরদিকে পেশোয়ারা পুনায় তাদের প্রতিপত্তি বিস্তার করেন। মোট সাতজন পেশোয়া ছিলেন।

বালাজি বিশ্বনাথ : 1714 খ্রিস্টাব্দে বালাজি বিশ্বনাথ এর উদ্যোগে লোনাবেলার সন্ধি দ্বারা পশ্চিম উপকূলের শাসক ও মারাঠা নৌবাহিনীর প্রধান কাহ্ণোজি আংরে-র সঙ্গে শাহুর মিত্রতা স্থাপিত হয়। 1714 খ্রিস্টাব্দে বালাজি বিশ্বনাথ মোঘল সেনাপতি সৈয়দ হোসেন আলীর সঙ্গে এক সন্ধি করেন। এই সন্ধির শর্ত অনুসারে শিবাজী অধিকৃত রাজ্যের উপর থেকে মোগলরা তাদের দাবি ত্যাগ করে এবং দাক্ষিণাত্যের মোগল অধিকৃত ছয়টি সুবা থেকে শাহু চৌথ ও সরদেশমুখী আদায়ের অধিকার পান। এর বিনিময়ে শাহু মোগল সম্রাট কে বার্ষিক দশ লক্ষ টাকার কর দিতে এবং হোসেন আলিকে 15 হাজার অশ্বারোহী সেনা দিয়ে সাহায্য করতে সম্মত হন।

প্রথম বাজিরাও : 1720 খ্রিস্টাব্দে পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথের মৃত্যুর হলে তার 19 বছর বয়স্ক পুত্র প্রথম বাজিরাও পেশোয়া পদ লাভ করেন। তাকে মারাঠা জাতির নেপোলিয়ন বলা হয়। তিনি ‘হিন্দু পাদ পাদশাহী' বা মারাঠা নেতৃত্বে হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনের আদর্শ ঘোষণা করেন। 1728 খ্রিস্টাব্দে বাজিরাও বুন্দেলখন্ড আক্রমণ করে ছত্রশাল এর পক্ষে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং মোগল শাসন কর্তা মোহাম্মদ শাহকে বিতাড়িত করেন। 1737 খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির উপকণ্ঠে হাজির হলে ভীত মূহম্মদ শাহ, নিজাম-উল-মূলক কে সংবাদ পাঠান। 1738 খ্রিস্টাব্দে ভূপালের যুদ্ধে নিজাম পরাজিত হন।

বালাজি বাজিরাও : প্রথম বাজিরাও এর মৃত্যুর পর তার পুত্র বালাজি বাজিরাও বা দ্বিতীয় বাজিরাও মাত্র 18 বছর বয়সে পেশোয়া পদ লাভ করেন। 1749 খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পূর্বে শাহু মারাঠা রাজ্যের সকল কর্তৃত্ব পেশোয়া কে অর্পণ করে যান। 1760 খ্রিস্টাব্দে উদগিরের যুদ্ধে মারাঠা বাহিনী নিজাম কে পরাজিত করে। 1757 খ্রিস্টাব্দে মারাঠা সেনাদল আফগানিস্তানের আমির আহমদ শাহ আবদালির প্রতিনিধি নাজিব-উদ-দৌলা কে বিতাড়িত করে দিল্লি দখল করেন। 1761 খ্রিস্টাব্দের 14ই জানুয়ারি আহমদ শাহ আবদালী, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও রহিলা সর্দার নজির খাঁ’র মিলিত বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে পেশোয়ার জ্ঞাতি ভ্রাতা সদাশিব রাও ও জৈষ্ঠ পুত্র বিশ্বাস রাও এর নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে বাজীরাও এর সেনাপতি রঘুজি ভোঁসলে নিরপেক্ষ থাকেন। পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে পেশোয়া বালাজি বাজিরাও ভগ্নহৃদয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

• পেশোয়া বালাজি বাজিরাও এর মৃত্যুর পর তার 17 বছরের পুত্র প্রথম মাধব রাও  পেশোয়া পদে বসেন। তার কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তার মৃত্যুর পর কনিষ্ঠ ভ্রাতা নারায়ণ রাও পেশোয়া হন। 1773 খ্রিস্টাব্দে নারায়ন রাও এর পিতৃব্য রঘুনাথ রাও তাকে হত্যা করে পেশোয়া পদ দখল করেন। মারাঠা সদ্দার নানা ফড়নবিশ রঘুনাথ কে বিতাড়িত করে নারায়ণের পুত্র দ্বিতীয় মাধব রাও বা মাধব রাও নারায়ন কে পেশোয়া নিয়োগ করেন।

দ্বিতীয় মাধব রাও : 1775 খ্রিস্টাব্দে রঘুনাথ রাও  ইংরেজদের সঙ্গে সুরাটের সন্ধি স্বাক্ষরিত করেন এবং রঘুনাথ ও ইংরেজদের যুগ্ম বাহিনী আরাসের যুদ্ধে পেশোয়ার দ্বিতীয় মাধব রাও এর সেনা দলকে পরাজিত করে। প্রথম ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
• 1776 খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও পেশোয়া দ্বিতীয় মাধব রাও এর মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।
• 1779 খ্রিস্টাব্দে বোম্বের ইংরেজ সরকার পুনরায় মাধব রাও এর কাছে তেলেগাঁওয়ের যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং ওয়াড়গাঁও এর সন্ধি স্বাক্ষরের বাধ্য হন।
• ওয়ারেন হেস্টিংস দীর্ঘদিন মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর পর 1782 খ্রিস্টাব্দে মারাঠা নায়ক মাহাদজি সিন্ধিয়ার মধ্যস্থতায় মারাঠাদের সঙ্গে সলবাইয়ের সন্ধি করতে বাধ্য হন।

দ্বিতীয় বাজিরাও : 1796 খ্রিস্টাব্দে পেশোয়া মাধব রাও নারায়ণের মৃত্যুর পর রঘুনাথ রাও এর পুত্র দ্বিতীয় বাজিরাও পেশোয়া হন।
• যশোবন্ত রাও হোলকার পুনা আক্রমণ করে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও ও দৌলত রাও সিন্ধিয়ার যুগ্ম বাহিনীকে পরাজিত করলে, দ্বিতীয় বাজিরাও পালিয়ে গিয়ে ইংরেজদের শরণাপন্ন হন এবং 1802 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের সঙ্গে বেসিনের সন্ধি স্বাক্ষর করেন।
• 1803 খ্রিস্টাব্দে দৌলত রাও সিন্ধিয়া ও ভোঁসলের যুগ্ম বাহিনী নিজামের রাজ্যের সীমান্তে উপস্থিত হলে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে সিন্ধিয়া ও ভোঁসলে পরাজিত হয়ে যথাক্রমে সুরজ-অর্জুনগাঁও এবং দেবগাঁও এর সন্ধি স্বাক্ষর করেন।
• 1804 খ্রিস্টাব্দে যশোবন্ত রাও হোলকার ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে যোগদান করেন এবং দিগ-এর যুদ্ধে পরাজিত হন। 1806 খ্রিস্টাব্দে তিনি গভর্নর জেনারেল স্যার জর্জ বার্লোর সঙ্গে রাজঘাট এর সন্ধি স্থাপন করেন।
• দ্বিতীয় বাজিরাও ইংরেজ বিদ্বেষী হয়ে এলফিনস্টোন কে গ্রেফতার করলে লর্ড হেস্টিংস বা লর্ড ময়রা দ্বিতীয় বাজিরাও এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং 1817 খ্রিস্টাব্দে তাকে পুনা চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। ফলে সিন্ধিয়া, ভোঁসলে ও হোলকার এর প্রতিবাদ করেন এবং তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূচনা হয়।
• 1817 খ্রিস্টাব্দে ভোঁসলে ও হোল কার যথাক্রমে সীতাবলদি ও মাহিদপুরের যুদ্ধে পরাজিত হন। 1818 খ্রিস্টাব্দে পেশোয়া কোরেগাঁও ও অস্ট্রির যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করলে তৃতীয়-ইঙ্গ মারাঠা যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং পেশোয়া পদ চিরতরে অবলুপ্ত হয়।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.