কোম্পানির বাংলা জয় || The British Conquest of Bengal


নবাব সিরাজউদ্দৌলা : 1756 খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগম এর পুত্র সিরাজউদ্দৌলা মাত্র 23 বছর বয়সে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব মনোনীত হন এবং তিনি মাত্র 15 মাস রাজত্ব করেছিলেন। সিরাজ এর প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন আলিবর্দীর জ্যৈষ্ঠ কন্যা ও ঢাকার ভূতপূর্ব শাসনকর্তার বিধবা পত্নী ঘসেটি বেগম, আলিবর্দীর মধ্যম কন্যার পুত্র পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা সৌকত জঙ্গ এবং ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভ। ইংরেজ এবং ফরাসিরা বিনা অনুমতিতে বাংলায় দুর্গ নির্মাণ শুরু করলে নবাব তাদের দুর্গ নির্মাণ কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। ফরাসিরা নবাবের কথা পালন করলেও ইংরেজরা তার কথায় কর্ণপাত করে না। ইংরেজদের আচরণে ক্রুদ্ধ সিরাজ 1756 খ্রিস্টাব্দের 4ঠা জুন প্রথমে কাশিমবাজার ও 20 শে জুন  কলকাতার ব্রিটিশ কুঠি ফোট উইলিয়াম আক্রমণ ও দখল করেন এবং কলকাতার নাম দেন আলিনগর (আলীবর্দী খাঁর নাম অনুসারে)। কলকাতার ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক এবং তার সহযোগীরা কলকাতার দক্ষিনে ফলতায় পালিয়ে যান। কোম্পানির কর্তাব্যক্তি হলওয়েল প্রচার করেছিলেন যে সিরাজ 146 জন ইংরেজকে বন্দী করে 18 ফুট × 14 ফুট 10 ইঞ্চি একটি ঘরে বন্দী করে রাখেন। পরেরদিন 123 জন শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়। এই ঘটনাকে ‘অন্ধকূপ হত্যা' বলা হয়। যদিও এই ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।  1757 খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে রবার্ট ক্লাইভ পুনরায় কলকাতার দখল নেন এবং সিরাজ ইংরেজদের সঙ্গে ‘আলিনগরের সন্ধি' করতে বাধ্য হন। 1757 খ্রিস্টাব্দে 23 জুন নদীয়ার পলাশীর আম্রকাননে সিরাজের 50 হাজার সৈন্য কে বাঁধা দিতে রবার্ট ক্লাইভ 2500 সৈন্য নিয়ে এগিয়ে আসেন । মিরমদন ও মোহনলাল বীর বিক্রমে যুদ্ধ করলেও সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বাস ঘাতকতা করলে সিরাজ পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন।

মীর জাফর : পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করার পর ইংরেজরা মীরজাফর কে বাংলার মসনদে বসান এবং তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করেন। ইংরেজরা মীরজাফরের উপর আর্থিক দাবিদাওয়া বৃদ্ধি করলে তিনি গোপনে ওলন্দাজ বণিকদের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। 1759 খ্রিস্টাব্দের 25 শে অক্টোবর রবার্ট ক্লাইভ বিদারার যুদ্ধে ওলন্দাজদের পরাজিত করেন। ক্লাইভ এর পরবর্তী কলকাতার গভর্নর ভ্যানসিটার্ট মীরজাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

মীর কাশিম : মীরকাশিম 1760 খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাবী পদে আসীন হন। স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার উদ্দেশ্যে তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারের মুঙ্গের এ রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করার উদ্দেশ্যে সমরু ও মার্কার নামে দুজন ফরাসি কে সেনাপতি পদে নিযুক্ত করেন। মুঙ্গেরে একটি বন্দুক ও কামানের কারখানা স্থাপন করেন। দুর্নীতিগ্রস্থ ও ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মচারীদের বিতাড়িত করেন। কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালার যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি মেজর অ্যাডামস এর কাছে মীরকাসিম পরাজিত হন। 1764 খ্রিস্টাব্দে 22 শে অক্টোবর মীরকাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও দিল্লির বাদশা শাহ আলম এর মিলিত বাহিনী সঙ্গে ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনীর বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়‌। এই যুদ্ধে ক্লাইভের সেনাপতি ছিলেন মেজর হেক্টর মনরো এবং মীরকাশিমের সেনাপতি ছিলেন মার্কার ও সমরু। এই যুদ্ধে মীর কাশিম পরাজিত হন এবং বাংলায় স্বাধীন নবাবীর অবসান ঘটে। বক্সারের যুদ্ধের পর ক্লাইভ বাংলায় দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করেন।
• মীর কাশিমের অবসানের পর 1763 খ্রিস্টাব্দে মীরজাফর পুনরায় বাংলার সিংহাসনে বসেন। 1765 খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হলে তার নাবালক পুত্র নজম উদ্দৌলা সিংহাসনে বসেন ।
• 1765 খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা কোম্পানি সঙ্গে আত্মরক্ষা মূলক সন্ধি স্থাপন করেন, যা ‘এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি' নামে পরিচিত।

দেওয়ানী লাভ : 1765 খ্রিস্টাব্দে 12 ই আগস্ট কোম্পানি মুঘল সম্রাট শাহ আলমের সঙ্গে ‘এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি' দ্বারা কারা ও এলাহাবাদে প্রবেশ এবং বার্ষিক 26 লক্ষ টাকা কর এর বিনিময়ে কোম্পানি শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী অর্থাৎ রাজস্ব আদায় ও দেওয়ানি বিচারের ভার লাভ করে।

রবার্ট ক্লাইভ : রবার্ট ক্লাইভ ভারতে ইংরেজ সম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। 1757 থেকে 1760 খ্রিস্টাব্দ এবং 1765 থেকে 1767 খ্রিস্টাব্দে দুবার তিনি বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। 1774 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি আত্মহত্যা করেন।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.