ইউরোপীয় বণিকদের ভারতে আগমন || The Advent Of Europeans


পর্তুগিজ : 1498 খ্রিস্টাব্দের 17 ই মে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ প্রদক্ষিণ করে ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত কালিকট (বর্তমান কোঝিকোড়) বন্দরে উপনীত হন। 1500 খ্রিস্টাব্দে ক্যাব্রালের নেতৃত্বে কালিকটে প্রথম পর্তুগিজ কুঠি নির্মিত হয়। কালিকটের অধিপতি জামোরিন কুঠিটি ধ্বংস করেন। জামোরিন এর প্রতিদ্বন্দ্বী কোচিনের রাজার সাহায্যে ক্যাব্রাল কোচিন এবং কান্নানোরে বাণিজ্যের অধিকার পান এবং 1502 খিস্টাব্দে কোচিনে একটি কুঠি নির্মাণ করেন। 1502 খ্রিস্টাব্দে 30 অক্টোবর ভাস্কো দা গামা দ্বিতীয় বার ভারতে আসেন। ফ্রান্সিসকো আলমেইদো ভারতে পর্তুগিজ অধিকৃত স্থানসমূহের প্রথম শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি কোচিন ও কান্নানোরে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন। 1503 খ্রিস্টাব্দে আলফানসো ডি আলবুকার্ক ভারতে পর্তুগিজ শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। 1510 খ্রিস্টাব্দে তিনি বিজাপুরের সুলতান এর কাছ থেকে গোয়া দখল করেন। তিনি পর্তুগীজদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ভারতীয় নারীদেরকে বিবাহ করার জন্য পর্তুগীজদের উৎসাহিত করেন। 1530 খ্রিস্টাব্দে নিনো দা কুনহা কোচিন থেকে গোয়ায় পর্তুগিজ রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তিনি 1535 খ্রিস্টাব্দে দিও ও 1559 খ্রিস্টাব্দে দমন অধিকার করেন। শাহজাহানের রাজত্বকালে 1631 খ্রিস্টাব্দে হুগলি পর্তুগীজদের হাতছাড়া হয়। 1661 খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ রাজার বোনকে বিয়ে করার জন্য রাজা ইংল্যান্ডের যুবরাজ দ্বিতীয় চার্লস কে যৌতুক হিসেবে বোম্বে প্রদান করেন।

ওলন্দাজ : 1602 খ্রিস্টাব্দে হল্যান্ডের কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ইউনাইটেড “ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি অফ দি নেদারল্যান্ডস” নামে একটি বাণিজ্যিক সংস্থা স্থাপন করেন। 1605 খ্রিস্টাব্দে ভারতের মসুলিপট্টম-এ ওলন্দাজরা প্রথম তাদের কুঠি স্থাপন করে। পুলিকট, চুঁচুড়া, পাটনা, বালেশ্বর, নেগাপট্টম, কোচিন, সুরাট, কারিকল, বরাহনগর, কাশিমবাজার প্রভৃতি ওলন্দাজদের বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল।

ইংরেজ : 1599 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থাপিত হয়। 1600 খ্রিস্টাব্দে 31 শে ডিসেম্বর লন্ডনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রানী এলিজাবেথ এর কাছ থেকে প্রাচ্য দেশে 15 বছরের জন্য বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার লাভ করে। 1608 খ্রিস্টাব্দে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ক্যাপ্টেন হকিন্স ইংল্যান্ড রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশ পত্র নিয়ে আগ্ৰায় জাহাঙ্গীরের দরবারে উপস্থিত হন। পর্তুগিজ নাবিক দের বিরোধিতায় তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। 1612 খ্রিস্টাব্দে এক নৌযুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পর্তুগিজরা পরাজিত হলে 1613 খ্রিস্টাব্দে সুরাটে ইংরেজদের প্রথম বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয়। 1615 খ্রিস্টাব্দে স্যার টমাস রো নামে ইংল্যান্ড রাজ প্রথম জেমসের দূত জাহাঙ্গীরের দরবারে উপস্থিত হন কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার জন্য। 1616 খ্রিস্টাব্দে গোলকুন্ডার অন্তর্গত মসলিপট্টম-এ তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয় (দক্ষিণ ভারতে ইংরেজদের প্রথম বাণিজ্যকুঠি)। 1633 খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যার হরিহরপুর ও বালেশ্বর এ তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয় (পূর্ব ভারতে প্রথম ইংরেজ বাণিজ্য কুঠি)। 1639 খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রগিরির রাজার কাছ থেকে তারা মাদ্রাস (চেন্নাই) শহর ইজারা নেন এবং মাদ্রাজে ফোর্ট সেন্ট জর্জ নামে একটি দুর্গ ও বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। 1651 খ্রিস্টাব্দে পাটনা, হুগলি ও কাশিমবাজারে তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়। 1661 খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ রাজকন্যার সঙ্গে ইংল্যান্ড রাজ দ্বিতীয় চার্লসের বিবাহ সম্পন্ন হলে যৌতুক হিসেবে তিনি বোম্বাই শহরটি লাভ করেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বোম্বাই শহর বিক্রি করে দেন। 1687 খ্রিস্টাব্দ থেকে বোম্বাই ইংরেজদের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। 1667 খ্রিস্টাব্দে  ঔরঙ্গজেবের ফরমান অনুসারে ইংরেজরা বাংলায় বাণিজ্যের অধিকার পায়। 1690 খ্রিস্টাব্দে জব চার্নক সুতানুটি গ্রামে একটি কুঠি নির্মাণ করেন। সুতানুটি, পার্শ্ববর্তী কলিকাতা এবং গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটি মিলে ক্যালকাটা শহরের উৎপত্তি হয়। 1696 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা কলকাতার কুঠিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামসের নাম অনুসারে এর নাম হয় ফোর্ট উইলিয়াম। 1700 খ্রিস্টাব্দে বাংলা প্রেসিডেন্সির মর্যাদা লাভ করে। 1717 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে জন সারম্যান এর নেতৃত্বে মোগল সম্রাট ফারুকশিয়ার এর কাছে এক দৌত্য প্রেরিত হয়। এই দৌত সারম্যানের দৌত্য নামে পরিচিত। 1717 খ্রিস্টাব্দে সারম্যান মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার এর কাছ থেকে একটি ফরমান আদায় করেন। এই ফরমান অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্যের অধিকার পায়।

ফরাসি : 1664 খ্রিস্টাব্দে ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই এর অর্থ সচিব কোলবার্ট এর উদ্যোগে প্রাচ্য দেশে বাণিজ্যের জন্য ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থাপিত হয় । ফরাসি সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো। 1668 খ্রিস্টাব্দে সুরাটে প্রথম এবং 1669 খ্রিস্টাব্দে মসুলিপট্টমে তাদের দ্বিতীয় কুঠি স্থাপিত হয়। 1673 খ্রিস্টাব্দে পন্ডিচেরিতে তাদের কুঠি স্থাপিত হয় এবং ক্রমে পন্ডিচেরি তাদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। 1674 খ্রিস্টাব্দে বাংলার শাসনকর্তা শায়েস্তা খাঁ চন্দননগরে তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি দেন । ক্রমে কারিকল, মাহে প্রভৃতি স্থানে তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়।

ডেনমার্ক : 1616 খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের ‘দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' গঠিত হয়। তারা 1620 খ্রিস্টাব্দে ট্রাঙ্কুবার (তামিলনাড়ু) এবং 1755 খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। 1845 খ্রিস্টাব্দে ড্যানিশরা তাদের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দেন।

অন্যান্য জাতি : 1722 খ্রিস্টাব্দে ফ্লান্ডার্স এর বণিকরা ‘ওস্টেন্ড কোম্পানি', 1731 খ্রিস্টাব্দে সুইডেনের বণিকরা ‘সুইডিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি',1755 খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার বণিকরা ‘অস্ট্রিয়ান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' গঠন করে ভারতে বাণিজ্যের চেষ্টা করেন। বলাবাহুল্য, এরা সফল হননি।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.