মুঘল সাম্রাজ্য || The Mughal Empire


• মুঘল শব্দের উৎপত্তি মোঙ্গল শব্দ থেকে ।
বাবর : ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহিরউদ্দীন মহম্মদ বাবর। তুর্কি ভাষায় বাবর কথার অর্থ সিংহ । পিতৃকুলের দিক থেকে বিখ্যাত তুর্কি বীর তৈমুর লং এবং মাতৃকুলের দিক থেকে মঙ্গল বীর চেঙ্গিস খাঁ তার পূর্বপুরুষ ছিলেন। 1483 খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার ফরঘনা রাজ্যে জহিরউদ্দীন মহম্মদ বাবর এর জন্ম হয়। ওমর শেখ মির্জার মৃত্যুর পর মাত্র 12 বছর বয়সে তিনি ফারঘনার অধিপতি হন। 1507 খ্রিস্টাব্দে ‘পাদশাহ' উপাধি নিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন । ইব্রাহিম লোদীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ লোদি এবং ইব্রাহিম লোদীর কাকা আলম খাঁ বাবরকে দিল্লি আক্রমণের জন্য অনুরোধ করেন । 1526 খ্রিস্টাব্দে বাবর 12 হাজার সৈন্য, কিছু বন্দুক ও কামানসহ দিল্লি আক্রমণ করলে সুলতান ইব্রাহিম লোদী 1 লক্ষ কুড়ি হাজার সৈন্য নিয়ে তাকে বাধা দেয়। এর ফলে পানিপথের প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ প্রথম পানিপথের যুদ্ধ নামে পরিচিত। ইব্রাহিম লোদী এই যুদ্ধে পরাজিত হন। 1527 খ্রিস্টাব্দে খানুয়ার প্রান্তরে বাবর এবং রানা সংগ্রাম সিংহের মধ্যে টানা 10 ঘন্টা যুদ্ধ হয় । এটি খানুয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। 1528 খ্রিস্টাব্দে চান্দেরির রাজপুত রাজা মেদিনী রায় কে চান্দেরির যুদ্ধে পরাজিত করেন। 1529 খ্রিষ্টাব্দে বিহারের শের খাঁ এবং জৌনপুরের মহম্মদ লোদীর মিলিত বাহিনীকে গোগরার বা ঘর্ঘরার যুদ্ধে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধের মাত্র এক বছর পর 1530 খ্রিস্টাব্দে 47 বছর বয়সে বাবরের মৃত্যু হয়। তুর্কি ভাষায় রচিত তার আত্মজীবনীর নাম ‘তুজুক-ই-বাবরি' বা ‘বাবরনামা’ । বাবর তার চার বছর রাজত্বে আগ্রার ‘লোদি দুর্গ', পানিপথের ‘কাবুলি বাগ মসজিদ', রহিলখন্ডের ‘জাম-ই-মসজিদ’ প্রভৃতি নির্মাণ করেন।

হুমায়ূন : বাবর এর মৃত্যুর পর তার চার পুত্র হুমায়ূন, কামরান, আসকারি ও হিন্দাল সিংহাসন লাভের জন্য বিবাদ শুরু করেন। হুমায়ূনের মা মহম সুলতানা হুমায়ুন কে সিংহাসনে বসার অনুমতি দেন। সিংহাসনে বসে তিনি তার তিন ভাইকে সাম্রাজ্যের 3 অংশের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। হুমায়ূন কথার অর্থ হল সৌভাগ্যবান। 1532 খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন দাদরার যুদ্ধে মামুদ লোদি ও তার অনুগামী আফগানদের পরাস্ত করেছিলেন। হুমায়ুন যখন বাংলাদেশে তখন আফগান নেতা শের খাঁ দিল্লি ও আগ্রা আক্রমণ করেন। ফলে হুমায়ুন 1539 খ্রিস্টাব্দে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বক্সার এর কাছে শের খার বাহিনীর সঙ্গে চৌসার যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই যুদ্ধে হুমায়ুন পরাস্ত হন‌। আফগান নেতা শের খাঁ কনৌজ, জৌনপুর, বাংলা ও বিহারের উপর আধিপত্য স্থাপন করেন। 1540 খ্রিস্টাব্দে ক্রুদ্ধ হুমায়ূন আবার শের খাঁর বিরুদ্ধে কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধে শামিল হন। এবার হুমায়ূন শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয়ে সস্ত্রীক পারস্যে পালিয়ে যান। অবশেষে 1555 খ্রিস্টাব্দে শেরশাহের বংশধর দের দুর্বলতার সুযোগে হুমায়ুন লাহোর, দিল্লী ও আগ্রা জয় করেন এবং ভারতে মোগল শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। দিল্লি দখলের সাত মাস পর 1556 খ্রিস্টাব্দে তার লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পড়ে তিনি মারা যান। তার ভগ্নি গুলবদন বেগম ‘হুমায়ুননামা’ রচনা করেন।

শেরশাহ : 1472 খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ বিহারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তার নাম ছিল ফরিদ খাঁ। তার পিতা হাসান খাঁ বিহারের অন্তর্গত সাসারামের জায়গিরদার ছিলেন। তিনি শূর বংশীয় আফগান ছিলেন। বিহারের সুলতান বহর খাঁ লোহানীর অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। একা একটি বাঘ মেরে তিনি শের খাঁ উপাধি লাভ করেন। বহর খাঁ লোহানীর মৃত্যুর পর তিনি তার নাবালক পুত্র জালাল খাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন। 1534 খ্রিস্টাব্দে জালাল খাঁ, বিহারের আমির-ওমরাহ এবং বাংলার সুলতান মামুদ শাহ এর সম্মিলিত বাহিনীকে তিনি সুরজগড়ের যুদ্ধে পরাজিত করে বিহারের স্বাধীন নরপতিতে পরিণত হন। 1539 খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধ এবং 1543 খ্রিস্টাব্দে বিল গ্রাম বা কনৌজের যুদ্ধে হুমায়ুনকে পরাজিত করে দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। 1545 খ্রিস্টাব্দে বুন্দেলখন্ডের কালীঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে এক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। তাকে সাহায্য করার জন্য চারজন মন্ত্রী ছিলেন – ‘দেওয়ান-ই-উজিরাৎ' বা প্রধানমন্ত্রী, ‘দেওয়ান-ই-আর্জ' বা রাজস্ব মন্ত্রী, ‘দেওয়ান-ই-রিসালৎ' বা সচিব এবং ‘দেওয়ান-ই-ইনসা' বা সামরিক বিভাগের মন্ত্রী। এদের সাহায্য করতেন ‘দেওয়ান-ই-কাজি' বা প্রধান বিচারপতি এবং ‘দেওয়ান-ই-বারিদ' বা গুপ্তচর বিভাগ। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি সমগ্র রাজ্যকে 47 টি সরকারে এবং প্রত্যেকটি সরকারকে আবার কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত করেন । প্রত্যেকটি সরকারে একজন করে শিকদার-ই-শিকদারান ( সামরিক দায়দায়িত্ব ও আইন-শৃংখলার রক্ষক ) ও মুনসেফ-ই-মুনসেফান ( দেওয়ানী মামলার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ) থাকতেন । শেরশাহই প্রথম জমির উপর প্রজার স্বত্ব স্বীকার করে প্রতিটি কৃষকের নামে একটি দলিল তৈরি করেছিলেন, এর নাম পাট্টা । আর একটি দলিল হলো সরকারি দলিল যার নাম কুবলিয়ত। শেরশাহের রাজস্ব মন্ত্রী জমি জরিপ করে জমির উর্বরতার উপর ভিত্তি করে সমগ্র কৃষিযোগ্য জমি কে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন - সরেস বা অতি উর্বর, মাঝারি বা উর্বর ও নিরেস বা কম উর্বর । বাণিজ্যের উন্নতির জন্য শেরশাহ রুপার মুদ্রা ‘রুপি’ এবং তামার মুদ্রা ‘দামের’ প্রচলন করেছিলেন। আলাউদ্দিনের মতো তিনি অশ্বারোহী বিভাগে দাগ ও হুলিয়া প্রথা চালু করেছিলেন। ব্রক্ষ্মজিৎ গৌড় এর মত ব্রাহ্মণ তার প্রধান সেনাপতি ছিলেন। সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে খবরা খবর আদান প্রদানের জন্য তিনি প্রথম ঘোড়ার পিঠে ডাক চলাচলের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন । বাংলাদেশের সোনারগাঁও বা ঢাকা থেকে সিন্ধুর থাট্টা পর্যন্ত দীর্ঘ 1400 মাইল লম্বা পথ নির্মাণ করেন, যার নাম ‘সড়ক-ই-আজম’ বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থে তিনি ঝিলামের তীরে রোটাসগড় দুর্গ নির্মাণ করেন । দিল্লির ‘পুরানা কিল্লা’ ও দুর্গের অভ্যন্তরস্থ ‘কিলা-ই-কুহনা' মসজিদ তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। সাসারাম এ নির্মিত তার সমাধি মন্দির তার শিল্পকির্তীর সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন । তার রাজত্বকালে মালিক মোহাম্মদ জায়সী হিন্দি ভাষায় ‘পদ্মাবত’ গ্রন্থটি রচনা করেন। ‘তারিখ-ই-শেরশাহী' এর রচয়িতা আব্বাস খান শেরওয়ানী তার সভাসদ ছিলেন।

আকবর : জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর হুমায়ূন এবং হামিদা বানু বেগমের সন্তান ছিলেন 1542 খ্রিস্টাব্দে অমরকোটে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । হুমায়ূনের মৃত্যুর পর 1556 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 12 বছর বয়সে দিল্লির সিংহাসনে বসেন । বৈরাম খাঁ নামক জনৈক অভিজ্ঞ রাজকর্মচারী তার অভিভাবক নিযুক্ত হন। 1556 খ্রিস্টাব্দে বিশাল মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে হিমু তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে অবতীর্ণ হন। এই যুদ্ধ দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে হিমু পরাজিত হন। 1560 খ্রিস্টাব্দে বৈরাম খাঁর পতনের পর দরবারের অধিকাংশ কাজ আকবরের ধাত্রীমাতা মহম অনাগা ও তার পুত্র আদম খাঁ এর নির্দেশে পরিচালিত হতো। 1562 খ্রিস্টাব্দে আকবর স্বহস্তে সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। 1561 খ্রিস্টাব্দে বাজ বাহাদুর কে পরাজিত করে মালব রাজ্য অধিকার করেন । আকবর মেবার বাদে রাজপুতনার অধিকাংশ অঞ্চল সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন । 1562 খ্রিস্টাব্দে রাজা বিহারি মলের কন্যা যোধাবাই কে বিবাহ করেন। 1572 খ্রিস্টাব্দে আকবর গুজরাট জয় করেন। গুজরাট জয়ের কথা স্মরণীয় করে রাখার জন্য ফতেপুর সিক্রিতে বুলন্দ দরওয়াজা নির্মাণ করেন। 1576 খ্রিস্টাব্দের 18 ই জুন আকবরের সেনাপতি মানসিংহ মেবারের রানা প্রতাপ সিংহকে হলদিঘাটের যুদ্ধে পরাস্ত করেন। রাজা মানসিংহ তার হয়ে বিহার, বাংলা এবং উড়িষ্যা জয় করেন। 1586 খ্রিস্টাব্দে আকবর কাশ্মীর এবং 1593 খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু জয় করেন। 1601 খ্রিস্টাব্দের আসিরগর যুদ্ধ ছিল তার জীবনের শেষ যুদ্ধ। 1605 খ্রিস্টাব্দে আকবর মারা যান। 1564 খ্রিস্টাব্দে আকবর হিন্দুদের উপর থেকে জিজিয়া কর তুলে দেন । 1575-76 খ্রিস্টাব্দে আগ্রার কাছে ফতেপুর সিক্রিতে ইবাদত খানা নির্মাণ করেন। 1582 খ্রিস্টাব্দে আকবর ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামে ধর্মমত প্রচার করেন । আবুল ফজল ও ফৈজি ( দুই ভাই ) এবং বীরবল তার নতুন ধর্মমত গ্রহণ করে। আকবর মনসবদারী প্রথার প্রবর্তন করেন। ‘মনসব’ কথাটির অর্থ হল পদমর্যাদা। এই প্রথা অনুসারে প্রত্যেক মনসবদার কে নির্দিষ্ট পরিমাণ সেনা ও ঘোড়া রাখতে হত। ‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’র রচয়িতা আবুল ফজল, ‘তাবাকাৎ-ই-আকবরী’ প্রণেতা নিজামুদ্দিন, ‘মুস্তাখাব-উল-তারিখ’ গ্রন্থের রচয়িতা বাদাউনি, কবি ফৈজি, হাস্য রসিক বীরবল, সঙ্গীতজ্ঞ তানসেন প্রভৃতি গুনি ব্যক্তিরা তার রাজসভা অলংকৃত করতেন। হিন্দি কবি তুলসীদাস এর 'রামচরিত মানস’ এবং ভক্তকবি সুরদাসের ‘সুরসাগর’ আকবরের সময় রচিত হয়েছিল। ফতেপুর সিক্রি, সেলিম চিস্তির সমাধি, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, জামি মসজিদ, বুলান্দ দরওয়াজা, হুমায়ুনের সমাধি, সেকেন্দ্রার আকবরের সমাধি ভবন, যোধাবাঈ প্রাসাদ, পাঁচমহল প্রভৃতি আকবরের সময় নির্মিত হয়েছিল।

টোডরমল এর ব্যবস্থা : রাজস্ব সংস্কার বিষয়ে আকবরের প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন রাজা টোডরমল । 1582 খ্রিস্টাব্দে টোডরমল রাজস্ব সংগ্রহের নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং এই ব্যবস্থা টোডরমলের ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। জমির উৎপাদিকা শক্তির উপর ভিত্তি করে তিন ধরনের রাজস্ব সংগ্রহ পদ্ধতি প্রবর্তিত হয় - জাবৎ বা জাবতি, গল্লাবকস এবং নাসক। এগুলির মধ্যে জাবতিপ্রথা উল্লেখযোগ্য। জাবতি প্রথা অনুসারে জমি কে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয় – পোলাজ ( যে জমিতে সারা বছর চাষ হয় ), পরৌতি ( যে জমিতে কিছুকাল চাষের পর পতিত রাখা হয় ), চাচর ( যে জমি তিন চার বছরের জন্য পতিত রাখা হয় ) এবং বানজার ( যে জমি 5 বছরের বেশি প্রতি তো রাখা হতো )।

জাহাঙ্গীর : আকবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র সেলিম ‘নূরউদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী' নাম ধারণ করে সিংহাসনে বসেন। 1615 খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা অমর সিংহ (মহারানা প্রতাপ এর পুত্র) জাহাঙ্গীরের আনুগত্য স্বীকার করেন। 1622 খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর পারসিকদের কাছে কান্দাহার হারান । বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে জাহাঙ্গীর দুর্বল হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি তার পত্নী নূরজাহানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তুর্কি ভাষায় তিনি তার আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী' রচনা করেন। তার আগ্রার রাজপ্রাসাদের বাইরে ‘জাঞ্জীর-ই-আদিল' নামে একটি শৃঙ্খল নির্মাণ করেন। কাশ্মীরের শালিমার গার্ডেন এবং নিষাদ গার্ডেন তার তৈরি । ভারতে বাণিজ্যের অনুমতি পাওয়ার জন্য ইংল্যান্ড রাজ প্রথম জেমস 1608 খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন হকিন্স এবং 1615 খ্রিস্টাব্দে স্যার টমাস রো কে জাহাঙ্গীরের দরবারে পাঠান। জাহাঙ্গীর পঞ্চম শিখ গুরু অর্জুনকে হত্যা করেন ।

নুরজাহান : নুরজাহানের পূর্ব নাম ছিল মেহেরউন্নিসা। তার পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ছিলেন একজন ভাগ্যান্বেষী পারসিক। তিনি আকবরের রাজত্বকালে কাবুলের দেওয়ান হন। 17 বছর বয়সে সুদর্শনা ও নানা গুণের অধিকারিনী কন্যা মেহেরুন্নিসার সঙ্গে আলি কুলি বেগ নামে জনৈক পারসিক যুবকের বিবাহ হয়। আলি কুলি বেগ বর্ধমানের জায়গীরদার নিযুক্ত হন এবং শের আফগান উপাধি লাভ করেন। আলি কুলি বেগ এর মৃত্যুর পর 1611 খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর মেহেরুন্নিসাকে বিবাহ করেন এবং তার নাম দেন নুরজাহান বা জগতের আলো । নানা গুণ ও সম্পন্ন হলেও প্রভুত্ব লোভী ও প্রতিহিংসাপরায়ণা এই নারীকে কেন্দ্র করে দরবারে ‘নুরজাহান চক্র' বলে একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। তার নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রচলিত হয় এবং তিনি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তিতে পরিণত হন। তার উপাধি ছিল ‘পাদশা বেগম' ।


শাহজাহান : জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তার তৃতীয় পুত্র খুররম ‘আবুল মুজাফফর মোহাম্মদ শাহজাহান বাদশাহ গাজী’ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসে তিনি বুন্দেলখন্ডের রাজা ঝুঝডর সিংহ এবং দাক্ষিণাত্যের প্রাক্তন সুবাদার খান জাহান লোদির বিদ্রোহ দমন করেন। শাহজাহানের রাজত্বকাল কে মোগল ইতিহাসের সুবর্ণ যুগ বলা হয়। 1633 খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান আহম্মদনগরকে তার সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। গোলকুণ্ডা ও বিজাপুর তার বশ্যতা স্বীকার করে । শাহজাহানের জীবনের শেষ আট বছর খুবই দুর্ভাগ্যজনক ছিল। সিংহাসনের অধিকার নিয়ে তার চার পুত্র দারা, সুজা, ঔরঙ্গজেব এবং মুরাদ এর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শাহজাহান দারাকে সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ঔরঙ্গজেব শাহজাহানকে আগ্রার দুর্গে বন্দী করেন এবং দিল্লির সিংহাসনে বসেন। 1666 খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শাহজাহানের কন্যা জাহানারা শাহজাহানের দেখাশোনা করেন। শাহজাহান আগ্রার ‘দেওয়ান-ই-আম’, ‘দেওয়ান-ই-খাস’, ‘শিশমহল’, ‘খাসমহল’, 'মোতি মসজিদ', ‘জামা মসজিদ' (সবচেয়ে বড় মসজিদ), লালকেল্লা, আগ্রার তাজমহল (শাহজাহানের পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিসৌধ, স্থপতি ঈশা খাঁ), ‘ময়ূর সিংহাসন' (স্থপতি বেবাদল খাঁ) ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন। এই যুগের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী নাদির সমরকান্দি, ‘গঙ্গাধর’ ও ‘গঙ্গা লহরী' কাব্য রচয়িতা জগন্নাথ পন্ডিত, ‘পাদশাহনামা’ রচয়িতা আব্দুল হামিদ লাহোরী এবং সঙ্গীতজ্ঞ সুখ সেন শাহজাহানের রাজসভা অলংকৃত করতেন ।

ঔরঙ্গজেব : ঔরঙ্গজেব 1618 খ্রিষ্টাব্দে গুজরাটের দাহোদে জন্ম গ্রহণ করেন । তিনি শাহজাহান ও মুমতাজ মহলের তৃতীয় পুত্র ছিলেন । 1657 খ্রিষ্টাব্দে শাহজাহান  অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তার জৈষ্ঠ্য পুত্র  দারা শুককে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করেন। তখন শাহজাহানের অপর তিন পুত্র সুজা বাংলায়, মুরাদ গুজরাটে এবং ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা ছিলেন । এর ফলে সুজা, মুরাদ এবং ঔরঙ্গজেব বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । 1658 খ্রিষ্টাব্দে সুজা দারার পুত্র সুলেমানের কাছে পরাজিত হয়ে বাংলায় ফিরে আসেন । অপরদিকে মুরাদ ও ঔরঙ্গজেব এর মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য দারা কাশিম খাঁ ও যশোবন্ত সিংহকে পাঠান । উজ্জয়নীর নিকটবর্তী ধর্মাট নামক স্থানে দুপক্ষের তুমুল লড়াই হয়। এই যুদ্ধে দারার বাহিনী পরাজিত হয়। মুরাদ ও ঔরঙ্গজেবের বাহিনী আগ্ৰার দিকে অগ্ৰসর হন । অগ্রার আট মাইল দূরে সামুগড়ে আবার দুপক্ষের লড়াই হয় । খলিল উল্লাহের বিশ্বাসঘাতকতায় দারা পরাজিত হয়ে লাহোরে পালিয়ে যান। ঔরঙ্গজেব পিতা শাহজাহানকে বন্দী করে আগ্রা অধিকার করেন। 1661 খ্রিস্টাব্দে মুরাদকে বন্দী করে তাকে হত্যা করেন। 1659 খ্রিস্টাব্দে সুজা দিল্লি অভিমুখে অগ্রসর হলে খাজোয়ার যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন এবং আরাকান অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে তার মৃত্যু হয়। 1659 খ্রিস্টাব্দে দারা গুজরাট থেকে দিল্লির দিকে অগ্রসর হলে দেওয়াই এর যুদ্ধে ঔরঙ্গজেব তাকে পরাজিত করেন। পরাজিত দারা পারস্যের পথে পলায়নের চেষ্টা করেন এবং ধরা পড়েন। ঔরঙ্গজেবের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়। 1608 খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের অভিষেক সম্পন্ন হয় এবং তিনি ‘আলমগীর বাদশাহো গাজী' (বিশ্ব বিজেতা) উপাধি ধারণ করেন । ঔরঙ্গজেব তার 50 বছরের রাজত্বে শেষ পঁচিশ বছর দাক্ষিণাত্যে কাটান। 1679 খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুনরায় জিজিয়া কর চালু করেন । তাকে 'দরবেশ' বা 'জিন্দা পিড়' বলা হতো । তার সময় দিল্লিতে মতি মসজিদ, লাহোরে পদশাহি মসজিদ এবং ঔরঙ্গাবাদে 'বিবি-কা-মকবরা' নির্মিত হয়েছিল । ঔরঙ্গজেব এর রাজত্ব কালে অনেক গুলি আঞ্চলিক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় –
• 1669 খ্রিষ্টাব্দে জমিদার গোকলা মথুরার অত্যাচারী ফৌজদার আবদুল নবির বিরুদ্ধে জাঠ বিদ্রোহ শুরু করেন ।
• 1672 খ্রিষ্টাব্দে গরিবদাস হাডা মথুরার নারনুলে সৎনামি বিদ্রোহ শুরু করেন।
• ধর্মীয় কারণে বুন্দেলারাজ চম্পত রায় বিদ্রোহ শুরু করেন, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। 1671 খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র ছত্রশাল স্বধীন হিন্দু রাজ্য গরেতলার জন্য বিদ্রোহ করেন (বুন্দেলা বিদ্রোহ) ।
• রাঠরের রাজা দুর্গাদাস এবং মেবারের রানা রাজসিংহ ও তার পূত্র জয়সিংহ ঔরঙ্গজেব এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন (রাজপুত বিদ্রোহ) ।
• 1675 খ্রিষ্টাব্দে ঔরঙ্গজেব নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুরের শিরচ্ছেদ করেন । দশম শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহ খালসা বাহিনী গঠন করে আজীবন মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.