পাত সঞ্চালন || Plate Tectonic Theory


• মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব (continental drift theory) : আলফ্রেড ওয়েগনারের মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব থেকে জানা যায় প্রায় 30 কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগ একটি বিশাল ভূখন্ড বা প্যানজিয়া রূপে অবস্থান করত। পরবর্তীকালে প্যানজিয়া ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন দিকে সঞ্চারিত হয় অর্থাৎ মহাদেশীয় ভূত্বক বা সিয়াল বিচ্ছিন্নভাবে মহাসাগরীয় ভূত্বক বা সিমার উপর বিভিন্ন দিকে সঞ্চারিত হয়। এই তত্ত্ব থেকে মহাদেশ, মহাসাগর সৃষ্টি, পর্বত গঠন, ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুদগমের মতো ঘটনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

• পাত সংস্থান তত্ত্ব (plate tectonic theory) :  ভূ বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর ভূত্বক কতগুলো শক্ত ও কঠিন খন্ডে বিভক্ত। এগুলোকে ভূ-বিজ্ঞানীরা এক একটা পাত বলেছেন। পাতগুলোর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফলের তুলনায় বেধ খুবই কম। পাতগুলো গড়ে 70 থেকে 150 কিমি পুরু। ভূপৃষ্ঠ থেকে বহিঃ গুরুমন্ডলের অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তর পর্যন্ত পাতগুলো বিস্তৃত। পিচ্ছিল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর পাতগুলো খুব ধীরগতিতে সঞ্চালন করছে। অস্থেনোস্ফিয়ারের পরিচলন স্রোত এর অন্যতম কারণ। পৃথিবীতে মোট ছয়টি বড় পাত এবং কুড়িটি মাঝারি ও ছোট পাত রয়েছে। ছয়টি বড় পাত হলো - ইউরেশীয় পাত, ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাত, আমেরিকা পাত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত, আফ্রিকা পাত এবং আন্টার্কটিকা পাত। পাতগুলো তাদের সীমানা বরাবর কখনো একে অপরের দিকে, কখনো বিপরীত দিকে, আবার কখনো পাশাপাশি ঘর্ষণ করে অগ্রসর হয়। এর প্রভাবে পাত সীমানা বরাবর ভূমিকম্প, অগ্নুৎপাত, ভঙ্গিল পর্বত, সমুদ্র খাত, দ্বীপ মালা প্রভৃতি সৃষ্টি হয়।

• অপসারী পাত সীমানা : সমুদ্র তলদেশে পাতের সীমানা বরাবর দুটো পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে সমুদ্র তলদেশে যে ফাঁকের সৃষ্টি হয় তা দিয়ে ভূ-অভ্যন্তরের ম্যাগমা ক্রমাগত বেরিয়ে আসে। এই ম্যাগমা পরে শীতল ও কঠিন হয়ে নতুন ভূত্বক বা পাত এবং সমুদ্রের তলদেশে মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা গঠন করে। এই পরস্পর বিপরীতমুখী পাতসীমানাকে অপসারী বা গঠনকারী পাত সীমানা বলা হয়।

• অভিসারী পাত সীমানা : অনেক সময় দুটো পাত পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয় এবং পাতের সংঘর্ষ ঘটে। দুটো পাতের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভারী পাত হাল্কা পাতের নিচে প্রবেশ করে। এর ফলে নিমজ্জিত পাতটির গলন হয়, সমুদ্র খাত সৃষ্টি হয় ও ভূত্বকের বিনাশ ঘটে। এই ধরনের পরস্পরমুখী পাত সীমানাকে অভিসারী বা বিনাশকারী পাত সীমানা বলা হয়। দুটো পরস্পরমুখী পাত সামুদ্রিক হলে তাদের ওপরের পলি ভাঁজ খেয়ে দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ সৃষ্টি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূল বরাবর জাপান ও সন্নিহিত দ্বীপপুঞ্জ এভাবে গড়ে উঠেছে। পাত দুটোর একটি সামুদ্রিক ও আরেকটি মহাদেশীয় হলে মাঝের পলি ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বত শ্রেণী সৃষ্টি করে। আমেরিকার পশ্চিম ভাগের রকি ও আন্দিজ পর্বতমালা এভাবে সৃষ্টি হয়েছে। আবার পাত দুটো মহাদেশীয় হলে সংঘর্ষের ফলে মাঝের সংকীর্ণ সমুদ্রের পলি ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়। এইভাবে ইউরেশীয় ও ভারতীয় এই দুই মহাদেশীয় পাতের মাঝের টেথিস সাগরের পলি ভাঁজ খেয়ে হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে।

• নিরপেক্ষ সীমানা : দুটি পাত পরস্পর ঘর্ষণ করে পাশাপাশি অগ্রসর হলে ভূমিকম্প, চ্যুতি প্রভৃতি সৃষ্টি হয়। এই সীমান্তে পাতের ধ্বংস বা সৃষ্টি কিছুই হয় না। একে নিরপেক্ষ সীমানা বলা হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত সান আন্দ্রিজ চ্যুতি এরকম সীমানার উদাহরণ। এই চ্যুতি বরাবর প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত উত্তরে ও উত্তর আমেরিকা পাত দক্ষিনে সরছে।

• পাতসঞ্চালন আমরা বুঝতে পারি না কেন? : পাত গুলো এত ধীর আর সুদীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চালিত হয় যে আমরা তা বুঝতে পারি না। প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত বছরে 10 সেমি করে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। আমেরিকান পাত পশ্চিমে সরছে বছরে মাত্র 2 থেকে 3 সেমি।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.