ভূমিকম্প || Earthquake


ভূমিকম্প : পৃথিবীর স্থিতিস্থাপক অভ্যন্তরে কোন সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে ভূত্বক কেঁপে ওঠে এবং ভূমিকম্প হয়। ভূ-আলোড়ন, পাতসঞ্চরন, অগ্নুৎপাতের মত প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও ভূগর্ভে গহ্বর, খনি ও সুরঙ্গ খনন, জলাধার নির্মাণ, ধস, বোমা বিস্ফোরণ ইত্যাদি কৃত্রিম কারণেও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র : ভূপৃষ্ঠের নিচে ভূ-অভ্যন্তরে যে স্থান থেকে ভূমিকম্পের উদ্ভব হয় তাহলো ভূমিকম্পের কেন্দ্র (Focus)। অধিকাংশ ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠ থেকে 50 থেকে 100 কিমি গভীরে হয়ে থাকে।

ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র : কেন্দ্র থেকে ঠিক উলম্ব দিকে ভূপৃষ্ঠের যে বিন্দুতে প্রথম কম্পন পৌঁছায় সেটা ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র (Epicentre)। ভূমিকম্পের ফলে উদ্ভূত শক্তি কেন্দ্র, উপকেন্দ্র থেকে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গ গুলোকে বলা হয় ভূ-কম্পন তরঙ্গ (Seismic Wave)। ভূকম্পন তরঙ্গ তিন ধরনের হয়।

প্রাথমিক তরঙ্গ (Primary wave/’P' wave) : সব থেকে দ্রুত এই তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠে প্রথম এসে পৌঁছায়। এর গতিবেগ 6 কিমি/সেকেন্ড। কঠিন, তরল, গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে দিয়ে ক্রমসংকোচন ও প্রসারণ প্রক্রিয়ায় এই তরঙ্গ প্রবাহিত হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ের তরঙ্গ (Secondary wave/'S' wave) : P তরঙ্গের পরে এই তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছায়। এই তরঙ্গের গতিবেগ সেকেন্ডে 3 থেকে 5 কিমি। এই তরঙ্গ বস্তু কণার উপর নিচে ওঠানামার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এই তরঙ্গ তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে না। শুধুমাত্র কঠিন পদার্থের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়।

পৃষ্ঠ তরঙ্গ (Level wave/'L' wave) : ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠ বরাবর পৃষ্ঠ তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গের গতিবেগ সেকেন্ডে 3 থেকে 4 কিমি। দুই ধরনের পৃষ্ঠ তরঙ্গ আছে – লাভ তরঙ্গ (Love wave) এবং রালে তরঙ্গ (Reyleigh wave)। পৃষ্ঠ তরঙ্গের কারনে বেশিরভাগ ক্ষয়ক্ষতি হয়।

ভূমিকম্পের পরিমাপ : ভূমিকম্প সিসমোগ্রাফ (Seismograph) বা ভূকম্প লিখ যন্ত্রে মাপা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রচুর ভূমিকম্প পরিমাপ কেন্দ্র আছে। কোন ভূমিকম্পের কয়েক মিনিটের মধ্যেই একাধিক সিসমোগ্রাফ এর তথ্য তুলনা করে ভূমিকম্পের কেন্দ্র, উপকেন্দ্রের অবস্থান, স্থায়িত্ব, তীব্রতা সব নির্ভুল ভাবে বলে দেওয়া যায়। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি ও তীব্রতার মাত্রা পরিমাপ করা হয় রিখটার স্কেলে (Richter Scale)। চার্লস রিখটার উদ্ভাবিত এই স্কেলের সূচক মাত্রা 0 থেকে 10। প্রতিটি মাত্রার ভূমিকম্প তার আগের মাত্রার চেয়ে 10 গুণ বেশি শক্তিশালী। রিখটার স্কেলে 6 এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হয়। 1960 সালে চিলির ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে 8.5।

ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল : অভিসারী, অপসারী, নিরপেক্ষ সমস্ত ধরনের পাত সীমানায় ভূমিকম্প হলেও অভিসারী পাত সীমানায় তীব্র ভূমিকম্প হয়ে থাকে। পৃথিবীর সমস্ত নবীন ভঙ্গিল পর্বত অঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয় : পৃথিবীর অধিকাংশ জীবন্ত আগ্নেয়গিরি প্রশান্ত মহাসাগরকে বলয়ের মতো ঘিরে রয়েছে। এজন্য প্রশান্ত মহাসাগরের দুদিকের উপকূলের আগ্নেয়গিরির বলয়কে ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়' (Pacific Ring of Fire) বলা হয়। পৃথিবীর 70% ভূমিকম্প এই বলয়ে হয়ে থাকে। জাপানের ফুজিয়ামা, ফিলিপাইনসের পিনাটুবো, ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট হেলেন্স, মেক্সিকোর পোপোক্যাটিপেটল, ইকুয়েডরের কোটোপ্যাক্সি প্রভৃতি আগ্নেয়গিরি এই অগ্নি বলয়ের অন্তর্গত।

মধ্য পৃথিবীর পার্বত্য বলয় : মেক্সিকো থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর, আল্পস, ককেশাস, হিমালয় হয়ে বিস্তৃত ‘মধ্য পৃথিবীর পার্বত্য বলয়' অথবা ‘মধ্য মহাদেশীয় বলয়' -এ পৃথিবীর 20 শতাংশ ভূমিকম্প ঘটে। ইতালির ভিসুভিয়াস, সিসিলির স্টম্বলি, এটনা প্রভৃতি আগ্নেয়গিরি এই বলয়ের অন্তর্গত।

ভারতে ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল : ভারতের তিন ভাগের দু'ভাগ অঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ। ভূমিকম্প প্রবনতার বিচারে ভারতকে 5 টি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। ভারতের ভূমিকম্প বলয় প্রধানত হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বিস্তৃত।

ভূমিকম্পের কয়েকটি ঘটনা :
•আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিস্কো এবং লস অ্যাঞ্জেলস শহর দুটো San Andreas Fault এর প্রায় ওপরে অবস্থিত। এই অঞ্চলে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত উত্তরে এবং উত্তর আমেরিকা পাত দক্ষিনে পাশাপাশি অগ্রসর হচ্ছে। ফলে সংলগ্ন অঞ্চলটা ভূগাঠনিক ভাবে অত্যন্ত অস্থির। প্রায়ই ভূ-আলোড়ন, ভূমিকম্প ঘটতে থাকে। 1906 সালে শক্তিশালী ভূমিকম্পে সানফ্রান্সিস্কো শহর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
•2004 সালের 26 শে ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের কাছে ভারত মহাসাগরের নিচে রিখটার স্কেলে 8.9 মাত্রার ভূমিকম্পে এবং ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাসে ভারতসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার 11 টা দেশে বহু ক্ষয়ক্ষতি ও তিন লক্ষ মানুষের প্রাণহানি হয়।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.