মধ্য যুগে ধর্মীয় আন্দোলন - ভক্তি আন্দোলন || Religious Movement - The Bhakti Movement


ভক্তি আন্দোলন : ভক্তিবাদের মূল কথা হল আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের মিলন।অনেকে বলেন যে ইসলাম বা খ্রিস্ট ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে ভক্তির প্রবেশ ঘটে। বলাবাহুল্য, এই মত গ্রহণযোগ্য নয় কারণ বেদের অভ্যন্তরে ভক্তির বীজ নিহিত আছে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ভক্তিবাদের কথা বলেছেন। জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম এই তিনটি পথের যেকোনো একটি দ্বারাই মুক্তি লাভ করা যায়।
• ভক্তিবাদীরা যাগযজ্ঞ,  শাস্ত্রীয় অনুশাসন বা কোন ধর্মীয় ক্রিয়া-কলাপ, জাতিভেদ ও পৌত্তলিকতার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। তারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। সকল প্রকার সংকীর্ণতা ত্যাগ করে মানুষে মানুষে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠাতেই তারা ব্রতী হন।
• খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে দাক্ষিণাত্যে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়। শৈব নায়নার এবং বৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায় এই আন্দোলনের সূচনা করে।

শংকরাচার্য : শংকরাচার্য অদ্বৈতবাদ এর দ্বারা দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনঃ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের হাত থেকে হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করার জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যোশী মঠ, গোবর্ধন মঠ, শৃঙ্গেরী মঠ ও সারদা মঠ নির্মাণ করেছিলেন।

রামানুজ : রামানুজ 1166 খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ’ এর প্রবক্তা। তিনি দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলনের রূপকার ছিলেন।

রামানন্দ : রামানন্দ প্রয়াগের কাছে মালকোটের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভবত খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ ও পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগে তিনি জীবিত ছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক রামানুজের শিষ্য ছিলেন এবং নিজে ‘রামাৎ বৈষ্ণব' সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বৈষ্ণব ধর্মের সাধারণ রীতি অনুসারে রাধা কৃষ্ণের উপাসনা না করে তিনি রাম সীতার উপাসনা করতেন। তিনিই প্রথম দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের মধ্যে যোগসুত্র স্থাপন করেন।তিনি হিন্দি ভাষায় ধর্ম প্রচার করতেন এবং সকল বর্ণের লোকদের শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। তার শিষ্য রবিদাস ছিলেন মুচি, কবির ছিলেন মুসলিম তাঁতি (জোলা), সোনা ছিলেন নাপিত এবং সাধন ছিলেন কসাই।

কবির : কবির রামানন্দের প্রধান শিষ্য ছিলেন। 1398 খ্রিস্টাব্দে বারানসি তে কবিদের জন্ম। কেউ কেউ আবার বলেন 1440 খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। কেউ আবার তাকে সুলতান সিকান্দার লোদীর (1489-1517 খ্রিষ্টাব্দ) সমসাময়িক বলে মনে করেন। তিনি এক বিধবা ব্রাক্ষ্মণীর গর্ভজাত অবৈধ সন্তান ছিলেন। তাই তার মা তাকে পুকুর পাড়ে ফেলে গেলে নিরু নামে এক নিঃসন্তান মুসলিম তাঁতি বা জোলা তাকে পালন করেন। এজন্য ছোট থেকেই তার মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম ভাবধারার সমন্বয় ঘটে। তার কাছে আল্লাহ ও রাম সমানভাবে পূজ্য এবং সকল মানুষই এক পরমেশ্বরের সৃষ্টি। কবিরের অনুগামীরা ‘কবিরপন্থী' নামে পরিচিত।তার নীতি ও উপদেশাবলী হিন্দিতে ‘দোহা’ নামে সংকলন গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

দাদু দয়াল : রামচন্দ্রের উপাসক, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অন্যতম প্রবর্তক এবং বিশিষ্ট কবি দাদু দয়াল বা দাদুর জন্ম বৃত্তান্ত ও জীবন কাহিনী কবিরের মতো রহস্যাবৃত্ত। তার জন্মস্থান আমেদাবাদ না রাজস্থান, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তার পিতা লোদি রাম একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম ছিলেন এবং পেশায় তিনি ছিলেন ধুনুরি। সম্রাট আকবরের প্রভাবশালী সভাসদ রাজা ভগবান দাস তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। 1584 খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রিতে দাদুর সঙ্গে আকবরের সাক্ষাৎ হয়। তার প্রিয় শিষ্য তিল্য, মোহন দফতরি, রজ্জব দাস, ছোট সুন্দর দাস প্রমূখ তার কবিতা ও বাণীর সংকলন করেছিলেন।

গুরু নানক : পাঞ্জাবের লাহোর জেলায় রাভি নদীর তীরে তালবন্দি গ্রামে (বর্তমান নাম নানখানা) 1469 খ্রিস্টাব্দে এক ক্ষত্রিয় পরিবারে গুরু নানক জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মের জটিল ও বাহ্যিক আড়ম্বর থেকে মুক্ত হয়ে ‘সৎ-শ্রী-আকাল’ অর্থাৎ সত্য স্বরূপ ভগবানের আরাধনাই ছিল নানক প্রবর্তিত ধর্মের মূলমন্ত্র। তিনি মনে করতেন যে ‘নাম’ বা ঈশ্বরের গুনোগান, ‘দান’ বা জীবের সেবা এবং ‘স্নান’ বা দেহের শুদ্ধির মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব। তার শিষ্যরা ‘শিখ’ নামে পরিচিত। শিখ শব্দটি সংস্কৃত ‘শীষ্য' কথার অপভ্রংশ। তার উপদেশ গুলি ‘গ্রন্থসাহেব' বা আদিগ্রন্থে সংকলিত আছে।

• শ্রী চৈতন্য : 1486 খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে দোল পূর্ণিমার দিন রাতে নদীয়ার নবদ্বীপের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে শ্রী চৈতন্যের জন্ম হয়। তার বাল্য নাম ছিল বিশ্বম্ভর। বাবা-মা আদর করে ডাকতে নিমাই। গায়ের রং গৌড় বা ফর্সা বলে প্রতিবেশীরা গৌরাঙ্গ বলে ডাকতেন। তার পিতা ছিলেন জগন্নাথ মিশ্র এবং মাতা ছিলেন শচীদেবী। 11 বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেন। পঠন-পাঠন শেষ করে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি একটি টোলের অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন। পন্ডিত কেশব কাশ্মিরী কে তর্কযুদ্ধে হারিয়ে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। 22 বছর বয়সে ঈশ্বরপুরীর কাছে তিনি কৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা নেন। 24 বছর বয়সে তিনি পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া কে ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন এবং তার নাম হয় ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’। তার জীবনের শেষ চব্বিশ বছর ধর্মপ্রচারে কাটিয়েছিলেন। 1533 খ্রিস্টাব্দের 9 জুলাই মাত্র 48 বছর বয়সে পুরীধামে তার অকাল প্রয়াণ ঘটে। তার শিষ্যদের মধ্যে উড়িষ্যা রাজ প্রতাপরুদ্রদেব, নিত্যানন্দ, শ্রীবাস, জীবগোস্বামী, রুপ-সনাতন, যবন হরিদাস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম মত ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম' নামে পরিচিত।

বল্লভাচার্য : 1479 খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের এক তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে বল্লভাচার্য জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে মথুরা ও বৃন্দাবনে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর দাক্ষিণাত্যে প্রেম ধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। কৃষ্ণের উপাসক বল্লভাচার্য জাতিভেদ মানতেন না। তিনি ‘ভগবদ্গীতা' ও ‘ব্রহ্মসূত্র’ এর টিকা এবং ‘শুদ্ধ অদ্বৈত' নামে একেশ্বরবাদ সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

মীরাবাঈ : আনুমানিক 1504 খ্রিস্টাব্দে যোধপুরের কুড়কি গ্রামে মীরাবাঈ এর জন্ম। তিনি মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের পুত্র শিশোদিও রাজা ভোজরাজ এর পত্নী ছিলেন (কোন কোন ঐতিহাসিক তাকে আকবরের সমসাময়িক রানা কুম্ভের পত্নী বলে মনে করেন)। কৃষ্ণ প্রেমে বিভোর হয়ে তিনি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে মথুরা ও বৃন্দাবনে সাধুসঙ্গে কালাতিপাত করেন। তার প্রচারের ফলে রাজপুতনায় কৃষ্ণ প্রেমের প্লাবন বয়ে যায়। ‘মীরার ভজন' নামে পরিচিত তার ভক্তিমূলক গান গুলি আজও ভারতীয় সাহিত্য ও সংগীতের মূল্যবান সম্পদ।

সুরদাস : সুরদাস পশ্চিম উত্তর প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি রাধা এবং কৃষ্ণের উপর কবিতা রচনা করেন। তিনি ‘সুর-সরবালি', ‘সাহিত্যলহরী' এবং ‘সুর-সাগর’ নামে গ্রন্থ রচনা করেন।

তুলসীদাস : তুলসীদাস বারাণসীর এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘রামচরিত মানস' এর রচয়িতা। তিনি তাঁর রচনায় আরবি এবং ফারসি শব্দও ব্যবহার করেছেন।

নরসিংহ মেহেতা : নরসিংহ মেহেতা গুজরাটের একজন সন্ন্যাসী ছিলেন। রাধাকৃষ্ণের উপর গুজরাটি ভাষায় অনেক গীত রচনা করেন। মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় ভজন 'বিষ্ণভা জান কো', তিনি রচনা করেন।

নাম দেব : নিচ বংশোদ্ভূত, বিষ্ণুর উপাসক ও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী নামদেব ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের জনজীবনে ভক্তিবাদের প্লাবন এনে দেন। হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের সেতুবন্ধনে তার অবদান অতি উল্লেখযোগ্য।

শংকরদেব : আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শংকরদেব ভক্তি ধর্ম প্রচার করেছিলেন।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.