জৈন ধর্ম || Jainism


• জৈন্য কথাটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ 'জিন' থেকে যার অর্থ 'জয়ী' | জৈন্য ধর্মের প্রবক্তা বা তীর্থঙ্কররা কাম, লোভ, ক্রোধ ও হিংসাকে জয় করেছিলেন বলে এরা 'জিন' বা 'জয়ী' বা 'জিতেন্দ্রীয়' | এদের প্রবর্তিত ধর্মই 'জৈন্য ধর্ম' নামে পরিচিত।
• ঋষভনাথ জৈন্য ধর্মের প্রবর্তন করেন | মোট 24 জন তীর্থঙ্করে মধ্যে প্রথম 22 জনের ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় না |
• 23 তম জৈন্য তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ ছিলেন বানারসের রাজা অশ্বসেনের পুত্র।  তিনি যে চারটি শিক্ষা দিয়েছিলেন তা 'চতুর্যাম' নামে পরিচিত -  অহিংসা, সত্য, অচৌর্য ও অপরিগ্রহ। এগুলির সঙ্গে মহাবীর সংযোজন করেছিলেন ব্রহ্মচর্য পালনের নির্দেশ | এই 5 টি উপদেশ কে একত্রে 'পঞ্চ মহাব্রত' বলা হয় ।
• 24 তম তীর্থঙ্কর হলেন বর্ধমান মহাবীর। তিনি 540 খ্রি: পূ: ( মতান্তরে 599 খ্রিস্টপূর্বাব্দে ) বিহারের মুজাফফর পুরের কুন্দগ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন  জ্ঞাত্রিক গোষ্ঠীর নেতা  সিদ্ধার্থ ও মাতা ছিলেন লিচ্ছবি রাজ চেতকের ভগ্নি ত্রিশলা । যশোদা নামে এক ক্ষত্রিয় রাজকন্যার সঙ্গে বর্ধমানের বিবাহ হয় এবং আনজ্জা বা প্রিয় দর্শনা নামে এক কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহন করে । 30 বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন । গোষাল নামে এক সাধুর কাছে 12 বছর কঠোর তপস্যা করেন । ঋজু পালিকা নদীর তীরে এক শাল গাছের নিচে তিনি 'কৈবল্য' বা 'দিব্য জ্ঞান' লাভ করেন এবং 'জিন' বা 'জিতেন্দ্রিয়' নামে পরিচিত হন । সব শেষে 'মহাবীর' হন । আনুমানিক 468 খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ( মতান্তরে 527 খ্রিস্টপূর্বাব্দে ) 72 বছর বয়সে বিহারের রাজগীরের পাবা পুরীতে অনশনে স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করেন । মহাবীর বিম্বিসারের সমসাময়িক ছিলেন ।
• মহাবীর আত্মার মুক্তির জন্য তিনটি পন্থার ওপর গুরুত্ব দেন এগুলি হল সৎ জ্ঞান, সৎ আচরণ ও সৎ বিশ্বাস । এই তিনটি নীতি কে বলে 'ত্রিরত্ন' বা 'সিদ্ধ শীল' ।
• খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষভাগে উত্তর ভারতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে বহু জৈন দক্ষিণ ভারতে চলে যান । বাকিরা স্থূলভদ্রের নেতৃত্বে মগধে থেকে যান । ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যের জৈনরা মহাবীরের অনুশাসন গুলি কঠোরভাবে মেনে চলতেন , তারা কোন গ্রন্থি বা বস্ত্র ধারণ করতেন না । এজন্য এদের নাম হয় দিগম্বর ।  অন্যদিকে স্থূলভদ্রের নেতৃত্বে উত্তর ভারতে জৈনরা শ্বেত বস্ত্র পরিধান করতেন, এজন্য এদের নাম হয় শ্বেতাম্বর ।
• অধিকাংশ জৈন ধর্মগ্রন্থ গুলি প্রাকৃত ও অর্ধ মাগধি ভাষায় রচিত ।
• 'দ্বাদশ অঙ্গ' ছাড়া ভদ্রবাহুর 'কল্পসূত্র' ( সংস্কৃতে লেখা , জৈনদের আদি শাস্ত্র গ্রন্থ যা 14 টি পর্বে রচিত মহাবীরের উপদেশাবলী সম্বলিত ) এবং হেমচন্দ্রের 'পরিশিষ্ট পার্বণ'ও  গুরুত্বপূর্ণ জৈন গ্রন্থ ছিল ।

প্রথম জৈন সম্মেলন : 300 খ্রিস্টপূর্বাব্দ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালে পাটলিপুত্রে স্থূলভদ্রের সভাপতিত্বে প্রথম জৈন     সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । এই সম্মেলনে জৈন ধর্ম শাস্ত্র কে 14 টি পর্বের পরিবর্তে 12 টি অঙ্গে সংকলিত করা হয় ।

দ্বিতীয় জৈন সম্মেলন :  512 খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের বলভীতে দেবরিধিগানির সভাপতিত্বে দ্বিতীয় জৈন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । এই সম্মেলনে জৈন ধর্মগ্রন্থ পুনরায় সংকলিত হয়, এই সংকলন 'জৈন আগম' বা 'জৈন সিদ্ধান্ত' নামে পরিচিত ।'জৈন সিদ্ধান্ত' আবার অঙ্গ, উপাঙ্গ, মূল ও সূত্র নামে চারটি ভাগে বিভক্ত ।
• ওড়িশার উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি পাহাড় এর জৈন গুহা মন্দির, জুনাগড় ও ইলোরার জৈন মন্দির, রাজস্থানের আবু পাহাড়ের দিলওয়ারা মন্দির , বিহারের পাভাপুরি মন্দির ও রাজগৃহ মন্দির, কর্নাটকের শ্রাবন বেলাগোলার গোমতেশ্বর এর মূর্তি প্রভৃতি স্থাপত্যে জৈন ধর্মের প্রভাব দেখা যায় ।

যে সমস্ত রাজারা জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন :   
উত্তর ভারত : নন্দ বংশীয় রাজারা, হর্ষঙ্ক বংশের রাজা বিম্বিসার, অজাতশত্রু ও উদয়ী, মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, বিন্দুসার এবং সম্প্রতি, অবন্তীর রাজা প্রদ্যুৎ, সিন্ধুর রাজা উদয়ন এবং কলিঙ্গরাজ খারবেল ।

দক্ষিণ ভারত : রাষ্ট্রকূট রাজা অমঘবর্ষ, চালুক্য রাজ কুমার পাল, সিন্ধুরাজ জয় সিং, গঙ্গ বংশ এবং কাদম বংশের রাজারা ।


No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.