রক্ত || Blood in Human Body


রক্ত : রক্ত এক রকমের অস্বচ্ছ, লবনাক্ত, ক্ষারধর্মী তরল যোগ কলা । রক্ত ভ্রূণের মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয় । রক্ত তার তরল ধাত্রের সাহায্যে দেহের বিভিন্ন কলা, যন্ত্র ও তন্ত্রের মধ্যে সংযোগ    সাধন করে,   তাই একে তরল যোগ কলা বলে । এক জন সুস্থ্য, স্বাভাবিক উচ্চতা   বিশিষ্ঠ   ( উচ্চতা ৫ ফুট, ওজন ৭০ কেজি )   প্রাপ্ত বয়স্ক  লোকের দেহে রক্তের পরিমান ৫ লিটার ।
•বেশির ভাগ মেরুদন্ডি প্রাণিদের রক্তের রং লাল । হিমোগ্লোবিন নামে লৌহ ঘটিত প্রোটিন জাতিয় রঞ্জক পদার্থ থাকায় রক্তের রং লাল হয় । অমেরুদন্ডি প্রাণিদের রক্ত রসে ও মেরুদন্ডি প্রানিদের লহিত রক্ত কনিকায়  হিমোগ্লোবিন থাকে ।পতঙ্গ শ্রেণির প্রাণিদের রক্তে কোনো রঞ্জক থাকে না । কবচী শ্রেণির প্রাণিদের ( চিংড়ি, কাঁকড়া )    রক্ত    রসে হিমোসায়ানিন নামে তাম্র ঘটিত রঞ্জক পদার্থ থাকায় রক্তের রং নীলাভ ।
• হিমোগ্লোবিন প্রধানত অক্সিজেন পরিবহন করে । পিত্ত ও মল-মূত্রের বর্ন গঠনে সহায়তা করে । মানুষের ১০০ ml রক্তে  হিমোগ্লোবিনের পরিমান ১৪.৫ গ্রাম ।
•পতঙ্গদের রক্তকে হিমোলিম্ফ বলে ।   চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি    প্রাণিদের রক্তকে হিমোসিলোমিক   তরল বলে।
•হিমোগ্লোবিনের অভাবে অ্যানিমিয়া বা রক্তহীনতা রোগ হয় ।

রক্তের উপাদানঃ  রক্ত প্রধানত প্লাসমা বা রক্তরস (৫৫%) এবং করপাসলস বা রক্ত কনিকা (৪৫%) নিয়ে গঠিত ।

রক্তরসঃ রক্তরস আবার কিছু অজৈব পদার্থ ( Na, K, Ca, Mg, P, Fe, Cu, I ) , জৈব পদার্থ ( শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট, হরমোন,   উৎসেচক, বিভিন্ন   অ্যাসিড ইত্যাদি ) এবং   বিভিন্ন গ্যাসিয় পদার্থ ( অক্সিজেন,   কার্বন   ডাই   অক্সাইড, নাইট্রোজেন )  দিয়ে গঠিত । রক্তরসে ৯১%-৯২% জল এবং ৮%-৯% কঠিন   পদার্থ থাকে ।   অজৈব   পদার্থ থাকে ৮%-৯%  ও জৈব পদার্থ থাকে ০.৯% ।

রক্তকনিকাঃ রক্তকনিকা তিন প্রকারের হয় । যথা -
     (১)  লোহিত রক্তকনিকা বা এরিথ্রোসাইট
     (২)  শ্বেত রক্তকনিকা বা লিউকোসাইট
     (৩) অনুচক্রিকা বা থ্রোম্বসাইটস বা প্লেটলেটস ।

লোহিত রক্ত কনিকাঃ লোহিত কনিকার গড় আয়ু ১২০ দিন। একজন  প্রাপ্তবয়স্ক      পুরুষের প্রতি ঘন মিলি মিটার রক্তে লোহিত কনিকারসংখ্যা গড়ে   ৫০ লক্ষ্য এবং   স্ত্রীর ক্ষেত্রে ৪৫ লক্ষ্য । মানুষের পরিণত লোহিত রক্ত কনিকা গোলাকার, দ্বি-অবতল হয় ।ভ্রূণ অবস্থায় ভ্রূণের ভাস্কুলোসা অঞ্চল থেকে এবং জন্মের পরে  অস্থিমজ্জার হিমোসাইটোব্লাস্ট কোষ থেকে লোহিত কনিকা সৃষ্টি হয় । বৃদ্ধ লোহিতকনিকাকে পয়কিলোসাইট বলে ।

শ্বেত রক্ত কনিকাঃ  শ্বেত কনিকার নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই , কোনো কোনো শ্বেত রক্ত কনিকা অ্যামিবার মতো হয় । শ্বেত    কনিকার   গড় আয়ু ১-১৫ দিন হয় । এই কনিকা অস্থিমজ্জা , প্লীহা ও   লসিকা  পিন্ড থেকে সৃষ্টি হয় । প্রতি ঘন মিলি মিটার রক্তে এই কনিকার সংখ্যা    ৬০০০-
৮০০০ টি ।সাইটোপ্লাজমে দানার  উপস্থিতির উপর নির্ভর করে এই
কনাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় -
     (১) গ্রানিউলোসাইট   (দানাদার ) এবং
     (২) অ্যাগ্রানিউলোসাইট   (দানাবিহীন ) ।    
গ্রানিউলোসাইট আবার তিন রকমের,যথা- নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল ।
অ্যাগ্রানিউলোসাইট দুই প্রকারের হয় , যথা - মনোসাইট ও লিম্ফোসাইট ।
     •নিউট্রোফিল      -  ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে জীবানু ধ্বংস করে।
     •ইওসিনোফিল    -  এলার্জি প্রতিরোধ করে।
     •বেসোফিল        -   হেপারিন নিঃসরন করে।
     •মনোসাইট        -   ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে জীবানু ধ্বংস করে।
     •লিম্ফোসাইট     -   অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে।

অনুচক্রিকাঃ আকারে গোল , ডিম্বাকার বা বেম আকৃতি বিশিষ্ট । অস্থিমজ্জার
মেগাক্যারীওসাইট কোষের ক্ষণ পদ থেকে সৃষ্টি হয় । প্রতি ঘন মিলি মিটার
রক্তে অনুচক্রিকার সংখ্যা  ২৫০০০০ - ৫০০০০০ টি হয় । এর গড় আয়ু ৩
দিন হয় ।

Rh-ফ্যাক্টর : 1937 সালে ল্যান্ডস্টেইনার (Landsteiner) এবং উইনার (Wiener) ভারতীয় বানর রিসার্স ম্যাকাকাসের রক্ত খরগোশের দেহে প্রবেশ করিয়ে খরগোশের সিরামে এক ধরনের অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করেন। একে তারা অ্যান্টি-Rh নামকরণ করেন। এই অ্যান্টিবডি অধিকাংশ শ্বেতকায় ব্যাক্তির লোহিত কণিকাকে পিন্ডে পরিনত করে অর্থাৎ অ্যাগ্লুটিনেশন ঘটায়। রিসার্স বানরের মত মানুষের দেহেও থাকে এই অ্যান্টিজেন। রিসার্স বানরের নামানুসারে এই অ্যান্টিজেনের নামকরণ করা হয়েছে Rh-ফ্যাক্টর । Rh যুক্ত রক্তকে Rh+ এবং Rh বিহীন রক্তকে Rh- রক্ত বলে। 85% লোকের রক্ত Rh+ ।

রক্তের উপাদানের তারতম্য জনিত অবস্থাঃ
     ১) পলিসাইথিমিয়া              -    লোহিত কনিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া ।
     ২) অ্যালিগোসাইথিমিয়া/     -     লোহিত কনিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়া(অ্যানিমিয়া)।
     ৩)লিউকোসাইথিমিয়া/       -    শ্বেত কনিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় দৃদ্ধি পাওয়া ( ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকিমিয়া)।                
     ৪) লিউকোপিনিয়া              -   শ্বেত কনিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়া ।
     ৫) থ্রম্বোসাইটোসিস             -   অনুচক্রিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া।
     ৬) থ্রম্বোসাইটোপিনিয়া/       -    অনুচক্রিকার সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়া  (পারপুরা)।

রক্তের বিভাগ: রক্তে উপস্থিত অ্যাগ্লুটিনোজেন ও অ্যাগ্লুটিনিন এর উপ্সথিতির উপর নির্ভর করে ভিয়েনার চিকিৎসক ল্যান্ড স্টেইনার রক্তকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেন , A , B , AB এবং O । সাধারন সমবিভাগের রক্ত ধারনকারী ব্যাক্তিদের মধ্যে রক্তের আদান প্রদান সম্ভব । অ্যাগ্লুটিনিন বা অ্যান্টিবডি না থাকার জন্য AB বিভাগের রক্ত ধারন কারী ব্যক্তি সব বিভাগের রক্ত নিতে পারে , তাই একে সার্বিক গ্রহীতা বলে । অ্যাগ্লুটিনোজেন বা অ্যান্টিজেন না থাকার জন্য  O বিভাগের রক্ত সব বিভাগকে রক্ত দিতে পারে , তাই একে সার্বিক দাতা বলে ।

রক্ত চাপঃ রক্তবাহের প্রাচীরে রক্ত যে পার্শ্বীয় চাপ প্রয়োগ করে তাকে রক্ত চাপ বলে । হৃৎপিন্ড যখন সঙ্কুচিত অবস্থায় থাকে , তখন যে সাবৃক চাপের     সৃষ্টি হয় তাকে সিস্টোলিক চাপ বলে । হৃৎপিন্ড যখন সিথিল অবস্থায় থাকে  তখন যে সার্বিক চাপ সৃষ্টি হয় তাকে ডায়াস্টলিক চাপ বলে ।একজন সুস্থ স্বাভাবিক প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক সিস্টোলিক চাপ ১২০ ১৩০ mm Hg . এবং ডায়াস্টোলিক  চাপ ৭০-৯০ mm Hg .। সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক  চাপের অন্তর ফলকে পালস   প্রেসার এবং গানিতিক গড়কে মিন প্রেসার বলে । স্ফিগমোম্যানোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে ব্রাকিয়ল ধমনীতে রক্তের চাপ মাপা হয় ।

কিছু প্রাণির হৃদপ্রকষ্ঠ সংখ্যাঃ
     মাছ           -     ২
     ব্যাঙ          -     ৩
     টিকটিকি   -     ৪ (অসম্পুর্ণ)
     কুমির        -     ৪
     পাখি          -     ৪
     স্তন্যপায়ী    -     ৪

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.