ভারতের নদনদী || Rivers of India


উত্তর ভারতের নদনদী :
সিন্ধু : সিন্ধু নদী তিব্বতের মানস সরোবর এর কাছে সিন-কাবাব প্রস্রবণ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের জম্মু কাশ্মীরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং পরে পাকিস্তানের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে পতিত হয়েছে। সিন্ধু নদীর দৈর্ঘ্য 2880 কিলোমিটার, এরমধ্যে 709 কিলোমিটার ভারতে অবস্থিত। শতদ্রু (শতলজ), বিপাশা (বিয়াস), ইরাবতী (রাভি), চন্দ্রভাগা, বিতস্তা (ঝিলাম) প্রভৃতি সিন্ধুর বাম তীরের উপনদী। শিক্ষা, গিলগিট, শিগার সিন্ধুর ডান তীরের উপনদী। সিন্ধুর একমাত্র শিয়োক উপনদীটিই কাশ্মীরের মধ্যে সিন্ধুর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। শতদ্রু সিন্ধুর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য উপনদী । এর তীরে ভাকরা ও নাঙ্গালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। বিপাশা নদীর তীরে মানালি, বিতস্তা নদীর তীরে শ্রীনগর এবং শতদ্রু নদীর তীরে ভাকরা উল্লেখযোগ্য শহর। 1960 সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে “সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে ভারত সিন্ধু, ঝিলাম এবং চেনাবের 20% জল ব্যবহার করতে পারে।

গঙ্গা : গঙ্গা কুমায়ুন হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা থেকে ভাগীরথী নামে উৎপন্ন হয়েছে। দেবপ্রয়াগে অলকানন্দা সঙ্গে মিলিত হয়ে গঙ্গা নামে পরিচিত হয়েছে। গঙ্গা নদী উত্তরাখন্ড, উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে । পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার গিরিয়ার কাছে গঙ্গা দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে, একটি শাখা ভাগীরথী নামে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে এবং অপর শাখাটি পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গঙ্গা নদীর দৈর্ঘ্য 2510 কিলোমিটার। এর মধ্যে 2071 কিলোমিটার ভারতের মধ্যে অবস্হিত। গঙ্গোত্রী থেকে হরিদ্দার পর্যন্ত প্রায় 320 কিলোমিটার গঙ্গার উচ্চ বা পার্বত্য গতি।  রামগঙ্গা, গোমতি, ঘর্ঘরা, গণ্ডক, বুড়িগণ্ডক, কোশী প্রভৃতি গঙ্গার বাম তীরের উপনদী এবং যমুনা ও শোন গঙ্গার ডান তীরের উপনদী। ঋষিকেশ, হরিদ্দার, কানপুর, এলাহাবাদ, বারানসি, গাজীপুর, পাটনা, ভাগলপুর, কলকাতা প্রভৃতি গঙ্গার তীরে অবস্থিত উল্লেখযোগ্য শহর। গঙ্গার দূষণ প্রতিরোধের জন্য 1985 সালে “সেন্ট্রাল গঙ্গা অথরিটি” নামে একটি তদারকি সংস্থার অধীনে “গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান” নামে এক কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

যমুনা নদী :  যমুনা নদী যমুনোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে এলাহাবাদ এর কাছে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং এর দৈর্ঘ্য 1300 কিলোমিটার। দিল্লি, মথুরা ও আগ্রা যমুনার তীরের উল্লেখযোগ্য শহর।

অলকানন্দা : বদ্রীনাথ এর নিকটবর্তী সতোপন্থ হিমবাহ থেকে অলকানন্দা নদীটি উৎপন্ন হয়ে রুদ্রপ্রয়াগে মন্দাকিনী নদীর সঙ্গে মিশেছে । এই মিলিত প্রবাহ দেবপ্রয়াগে ভাগিরথীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র : ব্রহ্মপুত্র নদী তিব্বতের মানস সরোবর এর কাছে চেমায়ুং দং হিমবাহ থেকে সাংপো নামে উৎপন্ন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নামচাবারোয়া শৃঙ্গ এর কাছে ডিহং নামে ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতে প্রবেশ করার পর প্রথমে অরুণাচল প্রদেশ এবং পরে বম্মপুত্র নামে আসামে উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়ে পদ্মার সাথে মিশেছে এবং এই মিলিত প্রবাহ মেঘনা নামে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। তিব্বতে এই নদীর নাম সাংপো ।  এই নদীর দৈর্ঘ্য 2900 কিলোমিটার। লোহিত, মানস, তিস্তা, তোর্সা, সুবর্নসিরি প্রভৃতি হলো এই নদীর উপনদী। এই নদীর তীরে ইটানগর, নওগাঁও, ডিব্রুগড়, গুয়াহাটি প্রভৃতি শহর গড়ে উঠেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের মাজুলী দ্বীপ পৃথিবীর বৃহত্তম নদী গঠিত দ্বীপ।

লুনি নদী : লুনি নদী আজমির এর কাছে আনা সাগর হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে থর মরু অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কচ্ছের রণে পতিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য 450 কিলোমিটার। এই নদীর জল লবণাক্ত এবং বর্ষার জলে পুষ্ট। লুনির উল্লেখযোগ্য উপনদী হল শুকরি ও জাওয়াই। ইম্ফল, ঘাগরা প্রভৃতি নদীর মতো লুনিও ভারতের উল্লেখযোগ্য অন্তর্বাহিনী নদী।

সবরমতী নদী : সবরমতি নদী আরাবল্লী পর্বত শ্রেণী থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ বাহিনী হয়ে কাম্বে উপসাগরে পড়েছে।

মাহী নদী : মাহী নদীটি বিন্ধ পর্বত শ্রেণী থেকে উৎপন্ন হয় প্রথমে উত্তর বাহিনী এবং পরে দক্ষিণ পশ্চিম বাহিনী হয়ে কাম্বে উপসাগরে পড়েছে।

সুবর্ণরেখা নদী : সুবর্ণরেখা নদী ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং বালিয়াপালের দক্ষিনে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এর গতিপথে রাঁচির কাছে বিখ্যাত হুড্রু জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রাহ্মণী ও বৈতরণী নদী : ব্রাহ্মণী ও বৈতরণী নদী ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে বিহার ও উড়িষ্যার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

দক্ষিণ ভারতের নদ-নদী :
নর্মদা নদী : নর্মদা নদী মহাকাল পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অমরকন্টক থেকে উৎপন্ন হয়ে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মধ্যে দিয়ে বিন্দ্ধ্য ও সাতপুরার সংকীর্ণ গিরি পথ অতিক্রম করে ব্রোচের কাছে খাম্বাত উপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীর গতিপথে ধুয়াধার জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে।

তাপ্তি নদী : তাপ্তি নদী মহাদেব পর্বতের মূলতাই এর কাছে উৎপন্ন হয়ে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট এর মধ্যে দিয়ে সাতপুরা ও অজন্তার মধ্যবর্তী সংকীর্ণ উপত্যকা পার হয়ে সুরাটের কাছে খাম্বাত উপসাগর পড়েছে। এর প্রধান উপনদী পূর্ণা।

গোদাবরী নদী : গোদাবরী মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলায় পশ্চিমঘাট পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য 1465 কিলোমিটার। এটি দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম নদী । এর বাম তীরের উপনদী গুলির মধ্যে প্রংহিতা, ইন্দ্রাবতী ও শবরী প্রধান এবং মঞ্জিরা হল এর ডান তীরের প্রধান উপনদী।

মহানদী : মহানদী ছত্রিশগড় এর উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ওড়িশার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য 890 কিলোমিটার।

কৃষ্ণা নদী: কৃষ্ণা নদী পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মহাবালেশ্বর এর কাছে উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে উৎপন্ন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় 1290 কিলো মিটার। তুঙ্গভদ্রা, কয়ানা, ঘাটপ্রভা, মুসী এবং ভীমা এই নদীর উপনদী। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু অংশ নিয়ে এই নদীর উপত্যকা।

কাবেরী নদী : কাবেরী নদী পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ব্রক্ষ্মগিরি শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয়েছে এবং তামিলনাড়ুর কুদ্দালোরের দক্ষিনে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য 805 কিলো মিটার। অমরাবতী, ভবানী, হেমাবতি এবং কাবিনি হল এই নদীর উপনদী। কাবেরী নদীর গতিপথে শিবসমুদ্রম জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে।

সরাবতী নদী : সরাবতী নদী একটি পশ্চিম বাহিনী নদী। এই নদীর গতিপথে যোগ বা মহাত্মা গান্ধী জলপ্রপাত বা গেরসোপ্পা জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে, যার উচ্চতা 289 মিটার। এটি ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.