পৃথিবীর গতি || Motion Of The Earth


• 476 খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ভারতীয় জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট বলেন, সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী তার চারদিকে ঘুরছে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে পোল্যান্ডের বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস প্রমাণ করেন পৃথিবী নয় সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্রে আছে পৃথিবী নিজের অক্ষের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে সূর্যের চারিদিকে পরিক্রমণ করছে।

পৃথিবীর গতি : পৃথিবীর দুই ধরনের গতি লক্ষ্য করা যায় - আবর্তন গতি বা আহ্নিক গতি এবং পরিক্রমণ গতি বা বার্ষিক গতি।

আহ্নিক গতি : পৃথিবী সূর্যের সামনে নিজ অক্ষ বা মেরুরেখার উপর সর্বক্ষণ নির্দিষ্ট গতিতে পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরছে। পৃথিবীর এই গতিকে আবর্তন গতি বলে। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরতে সময় লাগে 23 ঘন্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ড। সূর্য কে সামনে রেখে এক দিনে একবার পুরো পাক খাওয়ার দরুন এই সময়কে 'সৌর দিন' বা 'Solar Day' বলা হয়। পৃথিবীর সর্বত্র আবর্তন গতির মান সমান নয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তনের মান 1650 কিমি/ঘন্টা, কর্কটক্রান্তি রেখা এবং মকর ক্রান্তি রেখায় এই আবর্তনের বেগ 1550 কিমি/ঘন্টা, সুমেরু বৃত্ত এবং কুমেরু বিত্তে এই আবর্তনের মান 1275 কিমি/ঘন্টা এবং মেরু বিন্দুতে পৃথিবীর আবর্তনের মান 830 কিমি/ঘন্টা। কলকাতায় পৃথিবীর আবর্তন এর মান 1536 কিমি/ঘন্টা। 51½° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত লন্ডনে পৃথিবীর আবর্তন গতি ঘন্টায় 1050 কিলোমিটার।

ফেরেলের সূত্র : পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য যে শক্তির সৃষ্টি হয় তার নাম আবর্তনঘটিত শক্তি বা কোরিওলিস বল। এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। বায়ু প্রবাহের গতি বিক্ষেপ ফেরেলের সূত্র নামে পরিচিত। করিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোতও উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।

আহ্নিক গতির ফলাফল : আহ্নিক গতির ফলে পৃথিবীতে দিন রাত্রি, নিয়ত বায়ু প্রবাহের গতি বিক্ষেপ, সমুদ্র স্রোতের গতি বিক্ষেপ, জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি প্রভৃতি সংঘটিত হয়।

পরিক্রমণ গতি : পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর আবর্তন করতে করতে নির্দিষ্ট উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। পৃথিবীর এই গতিকে পরিক্রমণ গতি বা বার্ষিক গতি বলা হয়। পৃথিবীর বার্ষিক গতির বেগ সেকেন্ডে প্রায় 30 কিলোমিটার। সূর্যকে একবার পরিক্রমণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে 365 দিন 5 ঘন্টা 48 মিনিট 46 সেকেন্ড একে সৌর বছর বা Solar Year বলা হয়।

অধিবর্ষ : সাধারনত 365 দিনে 1 বছর হয়। ফলে প্রতিবছর প্রায় 6 ঘণ্টা করে সময় বাড়তি থেকে যায়। প্রতি 4 বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন (6×4 = 24 ঘণ্টা বা একদিন) বাড়িয়ে দিয়ে সেই সময়ের সমতা রাখা হয়। যে বছর এইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের একদিন বাড়িয়ে দিয়ে বছরকে 366 দিনে করা হয় সেই বছর কে বলে অধিবর্ষ বা Leap year। মিশরীয়রা প্রথম একটা অতিরিক্ত দিন যোগ করে হিসাব ঠিক রাখার উপায় আবিষ্কার করে।

পৃথিবীর কৌণিক অবস্থান : পৃথিবী যে কক্ষতলে অবস্থান করে তার সঙ্গে পৃথিবীর মেরুরেখা বা অক্ষ সর্বক্ষণ 66½° কোণ করে হেলে থাকে। এর ফলে পৃথিবীর নিরক্ষীয় তল কক্ষ তলের সঙ্গে যে কোন এর সৃষ্টি করে তার পরিমাণ দাঁড়ায় 23½°। পৃথিবীর মেরু রেখা পরিক্রমণ কালে তার কক্ষের সঙ্গে 66½° কৌণিকভাবে থাকার ফলে দিন রাত্রির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে ও ঋতু পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন পৃথিবী সৃষ্টির সময়ে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলেই পৃথিবীর অক্ষের এই হেলানো অবস্থান।

অপসুর ও অনুসুর :পৃথিবী যে উপবৃত্তাকার পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে তার নাভিতে সূর্যের অবস্থান‌। প্রদক্ষিণ করার সময় সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্ব সব সময় সমান থাকে না। সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে বেশি হয় 4ঠা জুলাই। এই সময় পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্ব থাকে 15 কোটি কোটি 20 লক্ষ কিলোমিটার। পৃথিবীর এই অবস্থানকে অপসুর (Aphelion) বলে। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম হয় 3 রা জানুয়ারি। এই দিন সূর্য থেকে পৃথিবী 14 কোটি 70 লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। পৃথিবীর এই অবস্থানকে বলা হয় অনুসুর (Perihelion)।

রবিমার্গ : পৃথিবীর হেলানো অক্ষের জন্য কক্ষপথে এমনভাবে কাত হয়ে ঘোরে যে বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিষুবরেখা, কর্কটক্রান্তি রেখা এবং মকর ক্রান্তি রেখায় সূর্যের লম্ব রশ্মি পড়ে। ফলে আপাতভাবে মনে হয় যে সূর্য পৃথিবীর বিষুবরেখা থেকে উত্তরে কর্কটক্রান্তি রেখা পর্যন্ত এবং দক্ষিনে মকর ক্রান্তি রেখা পর্যন্ত চলাচল করে। এটাই সূর্যের বার্ষিক আপাত গতি বা রবি মার্ক।

উত্তরায়ন ও দক্ষিনায়ন : বছরে দুদিন 21 শে মার্চ এবং 23 সেপ্টম্বর সূর্য রস্মি বিষুবরেখায় লম্বভাবে পড়ে। সূর্য রশ্মি 21শে জুন কর্কটক্রান্তি রেখায় এবং 22 শে ডিসেম্বর মকরক্রান্তি রেখায় লম্বভাবে পড়ে। 22 শে ডিসেম্বর থেকে 21শে জুন পর্যন্ত ছমাস ধরে সূর্যের উত্তরমুখী আপাত গতি হল উত্তরায়ণ এবং 21শে জুন থেকে 22 শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাস ধরে সূর্যের দক্ষিণমুখী আপাত গতি হলো দক্ষিণায়ন।

ঋতু : ভারতবর্ষে ছটি ঋতু বিরাজ করে। নিরক্ষীয় অঞ্চল এবং মেরু অঞ্চল ছাড়া সারা পৃথিবীতে গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত এই চারটি ঋতু প্রধান। আমাদের দেশে গ্রীষ্মের পরে বর্ষা এবং শরৎ এর পর কিছু দিনের জন্য হেমন্তকাল আসে।

উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল : পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে 21 শে মার্চ তারিখে এমন একটা জায়গায় চলে আসে যে বিষুবরেখায় লম্বভাবে রশ্মি পড়ে। এইদিন পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত সর্বত্র দিন রাত্রি সমান অর্থাৎ 12 ঘন্টা দিন ও 12 ঘন্টা রাত হয়। এই ঘটনাকে বিষুব (Equinox) বলা হয়। 'বিষুব' কথার অর্থ ‘সমান দিন ও রাত্রি'। 21 শে মার্চের বিষুবকে ‘মহাবিষুব’ (Vernal Equinox) বলা হয়।  মার্চ মাস থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময়ে দিন এবং রাত প্রায় সমান হওয়ায় আবহাওয়া গরম ও ঠান্ডার মাঝামাঝি থাকে। উত্তর গোলার্ধে এইসময় বসন্তকাল বিরাজ করে। এজন্য 21 শে মার্চের বিষুব কে উত্তর গোলার্ধে ‘বসন্তকালীন বিষুব' বলা হয়।

সংক্রান্তি : বছরের সবচেয়ে বড় এবং সব থেকে ছোট দিন দুটো প্রাচীনকাল থেকে বছর গণনা ও শস্য রোপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনো ভারত, আয়ারল্যান্ড , চীন ও দক্ষিণ আমেরিকায় সংক্রান্তি উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে।

উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল : 21 শে মার্চ এর পর থেকে পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন একটা জায়গায় আসতে থাকে যখন সূর্য রশ্মি ক্রমশ উত্তর গোলার্ধে লম্বভাবে পড়তে থাকে এর ফলে উত্তর গোলার্ধে ক্রমশ দিন বড় এবং রাত ছোট হতে থাকে এই সময়টা উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। 21শে জুন সূর্য রশ্মি কর্কটক্রান্তি রেখায় (23½° উত্তর) লম্বভাবে পড়ে। এই দিন উত্তর গোলার্ধে দিন সব থেকে বড় আর দক্ষিণ গোলার্ধে সবথেকে ছোট হয়। সুমেরুবৃত্তে 24 ঘন্টাই সূর্যকে দেখা যায় এবং কুমেরু বৃত্তে 24 ঘণ্টাই অন্ধকার থাকে। 21শে জুন কে ‘কর্কট সংক্রান্তি' (Summer Solstice) বলা হয়।

উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল : 21 শে জুনের পরে সূর্যের দক্ষিণায়ন শুরু হয়। 23 শে সেপ্টেম্বর তারিখে কক্ষপথে পৃথিবী এমন একটা অবস্থানে আসে যে সূর্যরশ্মি বিষুবরেখায় লম্বভাবে পড়ে। ফলে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত সর্বত্র দিন রাত সমান হয়। এইদিন কে ‘জলবিষুব’ বলা হয়। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত আবহাওয়া ঠান্ডা গরমের মাঝামাঝি থাকে। উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল বিরাজ করে। এজন্য 23 শে সেপ্টেম্বরের বিষুব কে ‘শরৎকালীন বিষুব' (Autumn Equinox) বলে।

উত্তর গোলার্ধে শীতকাল : 23 শে সেপ্টেম্বরের পর থেকে পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন একটা অবস্থানে আসে যখন সূর্যের লম্ব রশ্মি ক্রমশ দক্ষিণ গোলার্ধে পড়তে থাকে। ফলে দক্ষিণ গোলার্ধে দিন বড় এবং রাত ছোট হতে থাকে। এই সময় উত্তর গোলার্ধে শীতকাল আর দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। 22 শে ডিসেম্বর সূর্যরশ্মি মকর ক্রান্তি রেখায় (23½° দক্ষিণ) লম্বভাবে পড়ে। এই দিন দক্ষিণ গোলার্ধে দিন সব থেকে বড় এবং উত্তর গোলার্ধে দিন সব থেকে ছোট হয়। কুমেরু বৃত্তে 24 ঘন্টাই সূর্যকে দেখা যায় আর সুমেরুবৃত্তে 24 ঘন্টাই অন্ধকার থাকে। 22 শে ডিসেম্বর কে ‘মকর সংক্রান্তি' (Winter Solstice) বলা হয়।

মেরু বৃত্তে দিন ও রাত্রি : পৃথিবীর দুই মেরু বৃত্তে (66½° উত্তর অক্ষরেখা থেকে সুমেরু বিন্দু পর্যন্ত এবং 66½° দক্ষিণ অক্ষরেখা থেকে কুমেরু বিন্দু পর্যন্ত অঞ্চল) সারা বছরই সূর্যের আলো বাকা ভাবে পরে। মার্চ মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সময়ে উত্তর গোলার্ধে সুমেরুবৃত্ত অঞ্চলে সূর্য কখনোই দিগন্তের নিচ থেকে উঠে না বা অস্ত যায় না। এই সময় 24 ঘন্টা একটানা দিনের আলো থাকে। আবার সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে একইভাবে দক্ষিণ গোলার্ধে কুমেরু বৃত্ত অঞ্চলে এইরকম আলোকিত রাত্রি সহ একটানা দিন হয়। সূর্যের উত্তরায়নের সময় সুমেরুতে টানা ছয় মাস দিন ও কুমেরুতে টানা 6 মাস রাত হয় এবং দক্ষিনায়নের সময় কুমেরুতে টানা ছয় মাস দিন ও সুমেরুতে টানা ছয় মাস রাত হয়।

মধ্যরাত্রির সূর্য : মার্চ মাস থেকে জুন-জুলাই মাস এই সময়ে কানাডা, ডেনমার্ক, আলাস্কা, নরওয়ে, সুইডেন, আইসল্যান্ড এর অনেক জায়গা থেকে স্থানীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাত্রিতে কিছু সময়ের জন্য দিগন্ত রেখায় সূর্যকে দেখা যায়। নরওয়ের উত্তরে হামারফেস্ট বন্দরে মে মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সূর্যকে রাতের বেলায় স্পষ্টভাবে দেখা যায় বলে একে ‘মধ্য রাত্রির সূর্যের দেশ' বা ‘নিশীথ সূর্যের দেশ' (Land of Midnight Sun) বলা হয়।

No comments:

Post a Comment

Note: only a member of this blog may post a comment.